Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

পল্লবী ঘোষের অদম্য যাত্রা: ৭৫ হাজার মানুষের সেনা গড়ে মানব পাচারের বিরুদ্ধে লড়াই

একজন মানুষ যদি সমাজ পাল্টানোর দৃঢ় সংকল্প নেন, তবে তিনি কতদূর যেতে পারেন? উত্তর খুঁজতে হলে পল্লবী ঘোষের দিকে তাকাতে হয়। আজ তিনি মানব পাচারের বিরুদ্ধে দেশের সবচেয়ে নিরলস যোদ্ধাদের একজন। বেঙ্গালুরুতে বসেই তিনি গড়ে তুলেছেন ৭৫ হাজার মানুষের এক বিশাল সেনা, যারা দিনরাত লড়ছে অন্ধকার ব্যবসার বিরুদ্ধে।


পল্লবীর যাত্রা শুরু হয়েছিল দুই দশক আগে, যখন তার বয়স মাত্র ১৪। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক গ্রামে মামার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে তিনি দেখেন—এক অসহায় বাবা তার নিখোঁজ কন্যাকে খুঁজছেন। মাত্র ১২ বছরের মেয়েটি পল্লবীর চোখের সামনে হারিয়ে গেলেও কোনও সূত্র মেলেনি। কিন্তু সেই ব্যর্থতা তার মনে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়। লামডিংয়ের শান্ত রেলওয়ে শহরে, নিজের বাড়িতে ফিরে আসার পর থেকেই তিনি খুঁজতে থাকেন—এমন কেন ঘটছে? উত্তরে মেলে এক বিভীষিকাময় সত্য—মানব পাচার।

গবেষণায় তিনি আবিষ্কার করেন, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, অসম থেকে শুরু করে কর্নাটক পর্যন্ত অসংখ্য মেয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হরিয়ানা, রাজস্থানের মতো রাজ্যে, যেখানে তাদের দ্বিগুন বয়সি পুরুষদের সঙ্গে বলপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়।

২০২০ সালে আরও ভয়ঙ্কর এক চক্রান্ত সামনে আসে। মহামারির অরাজকতার সুযোগে কিছু শিশুকে ভুয়ো ‘কোভিড পজিটিভ’ ঘোষণা করে হত্যা করে তাদের অঙ্গ পাচার করা হচ্ছিল। এই তথ্য সামনে আসতেই পল্লবী প্রতিষ্ঠা করেন ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ডায়ালগ ফাউন্ডেশন। উদ্দেশ্য একটাই—মানব পাচার রোধ, ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার এবং পুনর্বাসন।

পল্লবীর সংস্থার কাজ শুধু শহরের মিটিং বা সেমিনারে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি পৌঁছে গেছেন সীমান্তবর্তী দুর্গম গ্রামেও।

তার ভাষায়, “আমরা দরজায় দরজায় গিয়ে মানুষকে বোঝাই কীভাবে পাচার ঘটে। গ্রামের প্রধান থেকে সাধারণ মানুষ—সবাইকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বলি, এ লড়াই আপনাদেরও।”

অনেকে ভাবেন পুলিশের সঙ্গে অভিযানে যাওয়া রোমাঞ্চকর। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে।

“কোনও কোনও অভিযানে পৌঁছতে আমাকে ১৫ ঘণ্টা ট্রেনে যেতে হয়, তারপর টোটো, তারপর পায়ে হাঁটা। অনেক সময় পুলিশের কাছেই বারবার বলতে হয় এফআইআর করুন, ৩৭০ ধারায় মামলা নিন। সব জায়গায় সঠিক তথ্যও মেলে না। তহবিল জোগাড় করাটাও এক বিশাল সমস্যা,” জানালেন পল্লবী।

তবুও এইসব কিশোরীদের হাহাকার উদ্বুদ্ধ করে পল্লবীকে, বারবার বিপদের মুখোমুখি হতে।

অসংখ্য উদ্ধার অভিযানের মধ্যে একটি ঘটনা আজও তাকে ব্যথিত করে। ২০১৭ সালে উত্তর ভারতের এক গ্রামে, বাবার অসুস্থতার কারণে এক কিশোরীকে তথাকথিত শিক্ষিত এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন তার মা।

সেখানেই মেয়েটি দাসপ্রথার শিকার হয়। পল্লবীর নেতৃত্বে সে উদ্ধার হলেও হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “মেয়েটি বুঝতেই পারছিল না তার সঙ্গে যে অমানবিক আচরণ হচ্ছে তা ভুল। ওর কাছে মনে হচ্ছিল—এভাবে সহ্য করলেই অন্তত খাবার পাবে।”

এই মানব পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইকে পল্লবীরা চার ধাপে সাজিয়েছেন। তিনি সংক্ষেপে বলেন ৪টি P—Prevention (প্রতিরোধ), Protection (সুরক্ষা), Partnership (সহযোগিতা) এবং Prosecution (বিচারপ্রক্রিয়া)। তার মতে, সমাজকে সচেতন করতে হবে, চুপ করে থাকলে চলবে না। পুলিশ, এনজিও, গ্রামীণ সংগঠন, এমনকি বেঁচে ফেরা ভিকটিমদেরও একত্র হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

এই লড়াইয়ের একমাত্র সমাধান স্বনির্ভরতা ও ন্যায়বিচার। তাই পল্লবীর প্রধান লক্ষ্য—উদ্ধার হওয়া মেয়েদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা। তিনি চান, প্রতিটি মামলারই বিচার হোক এবং অপরাধীরা শাস্তি পাক। কিন্তু বাস্তব চিত্র হতাশাজনক—প্রতি ১০০টি মামলার মধ্যে মাত্র একটিতে দোষী সাব্যস্ত হয়।

এর প্রতিকারে পল্লবীর উত্তর- প্রজেক্ট সহায়।
তার সংস্থা ২০২২ সালে অসমের লামডিং-এ শুরু করে প্রজেক্ট সহায়। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ উপজাতি পরিবারের কিশোরীদের জন্য চালু হয়েছে এক বছরের সেলাই প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য—জীবিকার সুযোগ তৈরি করে নতুন ভবিষ্যতের আলো জ্বালানো।

এটি একজন পল্লবী ঘোষের গল্প, যেখানে আছে কিশোরীর বিস্ময়, তরুণীর সাহস, আর আজকের লড়াকু নারী নেত্রীর দৃঢ়তা। ৭৫ হাজার মানুষের সেনা তার পাশে, কিন্তু লড়াই এখনও চলছে।