মৈত্রী মজুমদার: দক্ষিণ কলকাতার এক শান্তিপূর্ণ অভিজাত পাড়ায় বসবাসকারী একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন অলকনন্দা বাগচি। স্বামী-সন্তান, পাড়া-প্রতিবেশী নিয়ে কাটানো সাধারণ অথচ জমজমাট এক জীবন হঠাৎই অসাধারণ হয়ে উঠল যখন অলকনন্দা মেয়ে আবিষ্কার করলেন যে তাঁর বিরাশি বছর বয়সি মা, ইংরাজি ভাষায় লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি গল্প, যা হয়ে উঠতে পারে একটি আস্ত বই। এরপর আর কি! এক পারিবারিক বন্ধুর সহায়তায় বইটির ছাপা এবং প্রকাশের কাজটি করে মা-কে মাতৃ দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিলেন মেয়ে, জামাই, নাতি আর ছেলের বউ।
অলকনন্দা বাগচি-র লেখা ‘এ স্যুটেবল জব’ বইটি মূলত বারোটি ছোটগল্পের সংকলন। এই বারোটি ছোটগল্পে উঠে এসেছে বিবাহ, পেশা, পরিবার ও আত্মপরিচয়ের অন্তর্লোক। কলকাতার এক ছোট্ট কিচেন গার্ডেন ক্যাফেকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে এই গল্পগুলি, যেখানে মানুষের জীবনে নীরবে চলতে থাকা নানা অনুচ্চারিত অনুভূতি ধরা পড়েছে।
গল্পগুলিতে উঠে এসেছে এমন নারীদের অন্তর্জগৎ, যাঁরা বিবাহ, পেশা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পরিবার ও আত্মপরিচয়ের মতো জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নিজেদের পথ খুঁজে নিচ্ছেন। লেখার ভঙ্গি সচেতনভাবেই সংযত, শান্ত ও আত্মমগ্ন। প্রতিটি গল্প স্বতন্ত্র হলেও, একই পরিসর, কিছু পুনরাবর্তিত চরিত্র এবং একটি অভিন্ন অনুসন্ধান— অর্থপূর্ণ কাজের খোঁজ, অথবা বইয়ের ভাষায় “এ স্যুটেবল জব ”—তাদের একসূত্রে বেঁধেছে।
বই প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বই ও তার লেখিকা অলকনন্দা বাগচি বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন। একইভাবে প্রশংসিত হয়েছে বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণশিল্পী সর্বাণী ভট্টাচার্য-র কাজও। অনুষ্ঠানটি ছিল তারকাখচিত।
উপস্থিত ছিলেন দূরদর্শন খ্যাত ঘোষিকা ও বাচিক শিল্পী চৈতালী দাশগুপ্ত, অভিনেতা সুদীপ মুখার্জি, সুমিত সমাদ্দার সহ আরও গুণীজন। তা হয়ে উঠেছিল মনন ও হৃদয়ের এক অপূর্ব মিলনমেলা, যার আনন্দ সবার মুখেই প্রতিফলিত হচ্ছিল। অলকনন্দা বাগচির জীবন ও সাহিত্যকে উদ্যাপন করার উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল এই বই প্রকাশ অনুষ্ঠান।
সন্ধ্যার অন্যতম প্রধান অতিথি ছিলেন বন্দনা মুখোপাধ্যায়। যিনি অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর প্রাক্তন চিফ প্রোডিউসার ছিলেন এছাড়াও ইউনাইটেড নেশনস এবং কমনওয়েলথ এডুকেশন মিডিয়ার হয়ে বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে কাজ করেছেন।
বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে বন্দনা মুখোপাধ্যায় বলেন—
“আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখার সরলতা। অত্যন্ত সহজ ভাষায় গল্পগুলি বলা হয়েছে। আর একটি বিষয় বিশেষভাবে আমার নজরে এসেছে— লেখিকা ৮২ বছরের দীর্ঘ জীবন পার করেছেন, যা নানা চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। অল্প বয়সে মাকে হারানোর মতো গভীর বেদনাও তাঁর জীবনে এসেছে। কিন্তু তাঁর লেখায় কোথাও কোনো তিক্ততার ছাপ নেই। বরং এক আশ্চর্য আনন্দবোধ তাঁর প্রতিটি লেখায় ছড়িয়ে রয়েছে।
গল্পগুলি মিষ্টি রোম্যান্টিক গল্প নয়, আসলে কোনোটিই তা নয়। তবুও প্রতিটি গল্পের মধ্যে সেই আনন্দের সুর স্পষ্ট। আরও একটি মজার বিষয় হল, কখনও লেখিকা নিছক পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় রয়েছেন, আবার কখনও চরিত্রদের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। এই সহানুভূতিশীল বয়ানের ওঠানামা আমাদের বইয়ের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায়।
মালিনী, নেহা, নন্দিতা, চড়াই— এদের প্রত্যেককে যেন কোথাও চেনা লাগে। এরা আমাদের চারপাশের মানুষ, আমাদের মধ্যেকার নারী। লেখিকা সেই চেনার অনুভূতিটুকু তৈরি করতে পেরেছেন। যেমন আমরা সকলে এই ক্যাফেতে একত্রিত হয়ে গল্প করি, তেমনই এই চরিত্রগুলিও যেন আমাদের মধ্য থেকেই স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে। এই দিকটি সত্যিই অনন্য। আগেও বলেছি, এই গল্পগুলিতে আমি আশাপূর্ণা দেবীর সংবেদনশীলতার প্রতিফলন খুঁজে পেয়েছি। ইংরেজিতে এত সহজ অথচ আনন্দময় লেখা সাম্প্রতিক সময়ে খুব বেশি পড়েছি বলে মনে পড়ে না।”
অনুষ্ঠানের আরেক অতিথি প্রাক্তন রাজ্যসরকারি উচ্চশিক্ষাকর্মী এবং প্রাক্তন কলেজ শিক্ষিকা ও প্রিন্সিপাল ডঃ জয়শ্রী রায়চৌধুরী, বইটি পাঠ করার সময় থ্রিলার পাঠের মতো এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের কথা জানান।লেখিকা অলকনন্দা কথায় উঠে আসে তাঁর সাধারণ জীবনের এক অসাধারণ অভ্যাসের কথা। তিনি জানান ছোট থেকেই লিখতে ভালবাসেন তিনি। তাই সারাজীবন সংসারের সব কাজের মাঝেও লেখার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।
সারাদিন আশেপাশের লোকজন, ঘটনা ইত্যাদির থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতারই ফল এই গল্পগুলি। তিনি আরও বলেন তাঁর জীবনের দুই প্রধান মহিলা, মা এবং শাশুড়ি দুজনের জীবন যাপনের বৈপরীত্য এবং দুজনেরই এই বিপরীতমুখী যাপনের মধ্যে থাকা অকপট আন্তরিকতা তাঁকে নারীদের জীবন সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে, যদিও তাঁর পিতা ও স্বামীর মতো ভাল পুরুষ মানুষেরাও তাঁর লেখার উপজীব্য। শেষে অভিনেতা সুদীপ মুখোপাধ্যায়ের প্রশ্ন- গল্পের ভাষা ইংরাজি কেন?- এর উত্তরে তিনি বলেন- “নাতির জন্য, সে বাংলা পড়তে পারেনা।”
তাঁর নাতি এবং তাদের সমসাময়িক প্রজন্ম ভাষার কারণে গল্প পড়া থেকে যাতে বঞ্চিত না হয়, তাই এই উদ্যোগ নিয়েছেন অলকনন্দা। সবশেষে অভিনেতা সুমিত সমাদ্দার, যিনি ভুতের ভবিষ্যৎ ছবিতে ‘ভূতনাথ ভাদুড়ি’ চরিত্র-খ্যাত, বলেন- “যখন ৮২ বছরের এক তরুণী একটি বই লিখে ফেলতে পারেন… তখন আমাদেরও কলম চালিয়ে যেতেই হবে…”


