ফেলে দেওয়া টায়ার থেকে দীপাবলির আবর্জনা—অল্প বাজেটে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে সন্দীপের সৃজনশীলতা।
কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার সময় সদ্য স্কুল শেষ করেছিলেন সন্দীপ মণ্ডল। বাড়িতে বন্দি হয়ে এবং নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকায় তিনি আর্ট ও ক্রাফটের ভিডিও বানানো শুরু করেন। তবে পড়াশোনার চাপে নিয়মিত তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
হেরম্ব চন্দ্র কলেজের অ্যাকাউন্টেন্সির স্নাতক পরীক্ষা শেষ করার পরই—সে বিষয়টিকে গুরুত্বসহ দেখতে শুরু করে। যদিও কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না তার আর্ট-এর, বলা যায় স্বশিক্ষিত শিল্পী সে।
ঠিক সেই একই সময় গড়িয়ায় তার বাড়িতে সংস্কারের কাজ শুরু হয়, এবং সন্দীপ মণ্ডল সেই প্রক্রিয়াটি ভিডিও রেকর্ডিং করতে শুরু করেন। সেখান থেকেই একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও তার যাত্রার প্রকৃত সূচনা হয়।
এখন ২৩ বছর বয়সি সন্দীপ মণ্ডল সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ডিআইওয়াই গাই’ নামে পরিচিত। তাঁর ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল sm.createcorner-এ বর্তমানে ৩.৭৭ লক্ষেরও বেশি অনুসরণকারী রয়েছে এবং সেই সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
“অনেক সময় অনুপ্রেরণা আসে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকেই। আমার মনে হয়, সৃজনশীলতা নির্ভর করে সাধারণের মধ্যেই অসাধারণকে লক্ষ্য করার উপর,” বলে সে।
“শিল্প এমন এক শক্তি, যা আপনাকে মুক্ত করে, এমনকি যখন সামনের পথ অনিশ্চিত মনে হয়, তখনও আপনাকে নিজের দিশা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।”
কেউ যখন পুরোনো আসবাবের কাঠের ফ্রেম ফেলে দেয়, গড়িয়ার কাছে ডাঙার বাসিন্দা সন্দীপ সেখানে সম্ভাবনা দেখে। সে সেটি কুড়িয়ে নেয়, রং করে, নতুন আকার দেয় এবং নতুন উদ্দেশ্য দেয়। যেখানে অন্যরা কোনও কিছুকে ভাঙা বা অচল জিনিস দেখে, সে কল্পনা করে নেয়, সেটি কী হয়ে উঠতে পারে।
যদি সে কোনও পুরোনো পাংচার টায়ার খুঁজে পায়, তবে ৫ মিমি প্লাইউড, পুরোনো কাপড় এবং কিছু ধাতব চেন ব্যবহার করে সেটিকে একটি দেওয়াল ঘড়িতে পরিণত করে ফেলে।
আরও রয়েছে। ‘স্টে-অ্যাট-হোম আর্টিস্ট’ সন্দীপ, দীপাবলির ফেলে দেওয়া বাজীর আবর্জনা হাতে পেয়ে, সেটিকেও আসবাবে রূপান্তর করতে পারে। সামান্য প্লাইউড, কিছু আঠা এবং কয়েকটি ব্রাশের আঁচড়—এতেই অকেজো জিনিস আবার হয়ে ওঠে কার্যকরী ও আকর্ষণীয়।
“মধ্যবিত্ত জীবনও নান্দনিক হতে পারে”—এই বিশ্বাসে অটল সে।
তার লক্ষ্য, নিজের ‘নব্বইয়ের দশকের বাড়ি’-টিকে ধীরে ধীরে এক আধুনিক, আকর্ষণীয় আবাসে রূপান্তর করা।
যদিও অনেকেই এখনও তার কাজ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন, তবুও সে থেমে থাকে না। নিজের সাধারণ ঘর ও বারান্দাকে নতুনভাবে সাজানো, ফেলে দেওয়া তার দিয়ে ঝুলন্ত বড়দিনের গাছ তৈরি, পুরোনো মাটির হাঁড়ি ও রঙের বালতিকে টব বানানো, মায়ের বহু পুরোনো আলমারিকে নতুন রূপ দেওয়া—এমনকি এক টাকাও খরচ না করে একটি আকর্ষণীয় টেরারিয়াম তৈরি—সবই করে চলেছে সন্দীপ।
একটি মৃদু হাসি আর সহজ “হোলা!” ধ্বনি দিয়ে, সন্দীপ মণ্ডল ক্রমাগত বাধা ভেঙে চলেছে—মানুষকে নিজের আবেগ ও ভালোবাসা বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে অনুপ্রাণিত করছে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেও সাহস করে এগিয়ে যেতে বলছে।
ইনস্টাগ্রামে তার অধিকাংশ রিলই পায় প্রায় এক মিলিয়ন ভিউ। মায়ের সঙ্গে থাকা সন্দীপ নিয়মিত তার শিল্পকর্ম বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে—যার বেশিরভাগই তৈরি হয় তার নিজের বাড়িতেই, যেখানে সে প্রতিদিনই নতুন করে কোনও না কোনও কোণাকে জীবন্ত করে তোলে।
তার এই পদ্ধতি একেবারে অভিনব নয়। আন্তর্জাতিক স্তরে ড্রিউ মাইকেল স্কট(@lonefoxhome), জেনেভা ভ্যান্ডারজেইল(@genevavanderzeil), লিয়া গ্রিফিথ(@liagriffith) এবং ম্যান্ডি গুবলার(@vintagerevivals)-এর মতো পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও একই ধরনের কনটেন্ট দিয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।
তবে সন্দীপ তার অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করে অভিনব যাদব(@create_your_taste)-এর নাম, যার কাজ তাঁর সৃজনশীল যাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। তবে তার মতে, জীবনের অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
“আমার হয়তো অনেক সুযোগ ছিল না, কিন্তু শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায় ছিল যথেষ্ট। আর সেই শিক্ষা এখনও আমার কাজ ও একজন শিল্পী হিসেবে আমার যাত্রাকে প্রভাবিত করে,” বলে সে।
তাহলে ইনস্টাগ্রামে কনটেন্ট তৈরি করতে কত খরচ হয়?
“বড় কোনও আর্ট প্রজেক্টের জন্য আমি সাধারণত প্রায় ২ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করি। সেখান থেকে আমি প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ভিডিও তৈরি করতে পারি, ফলে প্রতিটি ভিডিওর খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা,” জানায় সে।
নিজের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কখনও কি সন্দেহ হয়েছে? প্রতিদিনের সাধারণ জিনিসকে নতুন কিছুতে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
তার মতে, প্রতিটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেই আলাদা চ্যালেঞ্জ থাকে। “বেশিরভাগ সময়ই আমি জানি না, প্রজেক্ট শেষ হলে সেটির চূড়ান্ত রূপ কেমন হবে। কখনও কখনও শেষ ফলাফল আমার কল্পনার মতো সুন্দর হয় না।”
অনেক শিল্পীর কাছে বাজেট একটি বড় বাধা মনে হলেও, সন্দীপের কাছে এটি বরাবরই ভিন্নভাবে ভাবার একটি সুযোগ।
“আমার যদি সীমাহীন বাজেটও থাকত, তবুও আমি সাধারণ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ দিয়ে অর্থপূর্ণ কিছু তৈরি করতেই পছন্দ করতাম,” বলে সে। “কারণ দিনের শেষে বাজেট নয়, বরং আপনার যা আছে সেটিকে কীভাবে দেখছেন এবং ব্যবহার করছেন —তার ওপরই সৃজনশীলতা নির্ধারণ করে।”


