কলকাতার খ্যাতনামা সেরামিক ও ইন্সটলেশন শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত জিতে নিলেন NDTV-র ‘মাস্টারস্ট্রোক আর্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ পাবলিক আর্ট ইনস্টলেশন অব দ্য ইয়ার সম্মান।
সমকালীন জনশিল্পে দুর্গাপুজোর মণ্ডপকে এক নতুন মাত্রায় রূপান্তর করার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
পার্থ দাশগুপ্তকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়েছে, দেবী দুর্গার প্রতিমাকে কেবল ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে নয়, বরং একটি ভাবনা, একটি বৌদ্ধিক উদ্দীপনা—যা চিন্তা, সংলাপ ও আত্মসমালোচনার পরিসর তৈরি করে—এইভাবে পুনর্কল্পনা করার জন্য।
তাঁর বৃহৎ আকারের ইনস্টলেশনগুলি ধারাবাহিকভাবে জনপরিসরকে গভীর ভাবে শিল্প-অভিজ্ঞতায় নিমগ্ন হওয়ার পরিসরে পরিণত করেছে, যেখানে দর্শন, বিভিন্ন সামাজিক প্রশ্ন এবং সমষ্টিগত জীবন এক সুতোয় বাঁধা।
২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো UNESCO-র মানবজাতির ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর বিশ্বব্যাপী প্রতিনিধিত্বের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে কেবলমাত্র এই একটি স্বীকৃতির গণ্ডির বাইরে গিয়েও দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহুদূর বিস্তৃত।
বছরের পর বছর ধরে বাংলার খ্যাতনামা শিল্পীরা(এবং বহু অনালোকিত কিন্তু সমান প্রতিভাবান কারিগর) সক্রিয়ভাবে পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের সৃজনশীল স্পর্শে প্রতিমা ও মণ্ডপে যুক্ত হয়েছে নান্দনিক উৎকর্ষ, যা উৎসবের শহরকে পরিণত করেছে ইনস্টলেশন শিল্পের অপূর্ব সমাবেশে। যা জনপ্রিয় ভাবে থিমের পুজো নামেই বেশী প্রচলিত।
এটি সাম্প্রতিক প্রবণতা বলে মনে হলেও, এই ঐতিহ্যের সূত্রপাত ১৯৭৫ সালে। সেই সময় প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী নিরোদ মজুমদার কলকাতার বকুলবাগান পুজোর জন্য মা দুর্গার প্রতিমা নির্মাণে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে শিল্পী শানু লাহিড়ি, মীরা মুখার্জি, বিকাশ ভট্টাচার্য, নিরঞ্জন প্রধান, ইশা মহম্মদ প্রমুখ শিল্পীরা শহরের বিভিন্ন পুজোয় তাঁদের শিল্প পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে প্রতিমাকে দিয়েছেন অভিনব রূপ।
সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ভবতোষ সুতার, সনাতন দিন্দা, পার্থ দাশগুপ্ত, সুশান্ত পাল, প্রদীপ দাস প্রমুখ শিল্পীরা কেবল প্রতিমা নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে মণ্ডপের প্রতিটি দিক—থিম, নকশা, স্থাপত্য, আলোকসজ্জা—সবকিছুতেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন। তাঁরা প্রশিক্ষিত আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের এবং কারিগরদের সমন্বয়ে যুক্ত করেন, যাতে দর্শকদের জন্য তৈরি হয় এক সম্পূর্ণ শৈল্পিক অভিজ্ঞতা।
বর্তমানে এটি প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে—প্রতিটি পুজো কমিটির অধীনে থাকেন একজন শিল্প-পরিচালক, যার তত্ত্বাবধানে প্রায় এক বছর ধরে বিপুল বাজেট নিয়ে হাজার হাজার মানুষ কাজ করেন একটি চাক্ষুষ ‘অভিজ্ঞতা’ নির্মাণের লক্ষ্যে।
মহালয়ার পর থেকেই প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী এই শিল্প-আয়োজনে ভিড় জমান। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। শিল্প-পরামর্শদানকারীদের সূক্ষ্ম দৃষ্টির অধীনে বিভিন্ন পুজোয় প্রতিমার পুনর্কল্পনা, কারুশিল্পের উদ্ভাবন, বিশালাকৃতির কাঠামো, দৃষ্টিনন্দন আলোক-প্রযুক্তি এমনকি কল্পনাকেও অতিক্রম করা পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য শিল্পমহল।
পুরস্কার গ্রহণের সময় পার্থ দাশগুপ্ত বলেন, দুর্গাপুজো এমন এক অনন্য মঞ্চ যেখানে শিল্প স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনমানসে পৌঁছে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, শিল্পকে ‘হোয়াইট কিউব’-এর সীমাবদ্ধ গ্যালারির গণ্ডি থেকে বের করে সরাসরি রাস্তায় নিয়ে যাওয়াই হল সবচেয়ে খাঁটি জনঅভিব্যক্তি।
এই সম্মান তিনি উৎসর্গ করেছেন সেইসব অগণিত কারিগর, শিল্পী ও সহযাত্রীদের, যাঁদের নিরলস পরিশ্রম ও সৃজনশীল সহযোগিতায় প্রতি বছর গড়ে ওঠে এই বিশাল ইনস্টলেশন শিল্পের জগৎ।


