একসময় বালিগঞ্জের এক নির্জীব, অবহেলিত গলি, দেওধর স্ট্রিট —আজ সেটাই রূপ নিয়েছে এক অনন্য পাবলিক আর্ট স্পেসে। প্রায় ৮,২০০ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত ‘কালার করিডর’ এখন কলকাতার অন্যতম বৃহত্তম সমকালীন ম্যুরাল প্রকল্প, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন ভিজ়্যুয়াল শিল্পী সায়ন মুখার্জি। এই উদ্যোগে সহযোগিতা করেছে স্টার্ট ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন এবং এশিয়ান পেইন্টস।
সায়নের কথায়, “এই প্রকল্পের সূচনা আসলে স্টার্ট ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন থেকেই। তারা ট্রাই-আর্ট গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করছিল, আর সেই প্রদর্শনীরই সম্প্রসারণ হিসেবে এই ম্যুরালের ভাবনা আসে। জায়গাটা যেহেতু প্রকৃতিগত ভাবে একটি জনপথ—যেখানে মানুষ প্রতিদিন হেঁটে যায়—তাই ‘কালার করিডর’ নামটা খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে।”
এশিয়ান পেইন্টস এই সহযোগিতায় যুক্ত হয়েছিল একটি সুস্পষ্ট ও উচ্চাভিলাষী ভাবনা নিয়ে। তাদের ৫,৩০০-রও বেশি রঙের শেডের বিশাল ভাণ্ডার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এমন একটি পাবলিক আর্ট তৈরি করার লক্ষ্য ছিল, যা রঙের সেই বিস্তৃত জগতকে প্রতিফলিত করবে। সায়ন বলেন, “সব রঙ ব্যবহার করা সম্ভব নয়, কিন্তু সেই রঙের আত্মাটাকে ধরা ছিল আসল উদ্দেশ্য। আমি চেয়েছিলাম দেওয়ালটা যেন জীবন্ত, স্তরযুক্ত এবং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে—যেখানে রঙই হয়ে উঠবে অভিজ্ঞতা।”
এই ম্যুরালের কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর ব্যক্তিগত ভাবনা—‘ঘরের বাইরে ঘর’। সায়নের ব্যাখ্যা, “আমার কাছে ঘর মানে শুধু মানুষ নয়। ঘর মানে ঘরের বিভিন্ন বস্তু, স্মৃতি, অভ্যাস—যেগুলোর সঙ্গে আমরা বড় হয়ে উঠি। সেই নিঃশব্দ জিনিসগুলোই আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।”
ম্যুরাল আঁকার আগে স্টার্ট ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন পুরো জায়গাটির প্রস্তুতির দায়িত্ব নেয়। ভাঙাচোরা, অন্ধকার দেয়ালগুলো মেরামত করে একেবারে নতুন ক্যানভাসে পরিণত করা হয়। “আগে এই গলিটা খুবই নোংরা আর মৃতপ্রায় ছিল,” বলেন সায়ন। “দেয়ালগুলো প্রস্তুত হওয়ার পর থেকেই পরিবর্তনটা অনুভব করা যাচ্ছিল।”
এই প্রকল্পের অন্যতম বিশেষত্ব হল —এখানে মানুষের মুখ বা অবয়বকে কেন্দ্র করে গল্প বলা হয়নি। বরং সায়ন বেছে নিয়েছেন দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বস্তুগুলিকে।
“মানুষের ছবি দেখিয়ে সংযোগ তৈরি করা সহজ,” তিনি বলেন। “আমি নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম—মানুষ ছাড়াই ‘ঘর’-এর অনুভূতি দেখানো যায় কিনা প্রমাণ করার?”
ফলাফল হিসেবে উঠে এসেছে এক ভিজ়্যুয়াল আর্কাইভ—লেটার বক্স, গ্রামোফোন, সংবাদপত্র, প্রেসার কুকার, লাঞ্চ বক্স, আলমারির উপর রাখা রঙিন টেলিভিশন, পুরনো সুইচ, এমনকি দাদুর চেয়ার। “এই জিনিসগুলোর সঙ্গেই আমরা বড় হয়েছি,” সায়ন বলেন। “এগুলোর অনেকই এখন হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নিঃশব্দে তারা আমাদের সংস্কৃতিকে বহন করে।”
অন্যদিকে বিপরীত দেওয়ালে বৃহত্তর শহরের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কিছু মানবচরিত্রের পাশাপাশি সায়নের আগের কাজের সূক্ষ্ম উল্লেখ রয়েছে—২০২৩ সালের আঁকা ট্রাম এবং গত বছরের ট্যাক্সি। “আমি চেয়েছিলাম এই উপাদানগুলো স্বাভাবিকভাবে ছবির মধ্যে মিশে যাক,” তিনি বলেন। “এটা আমার নিজের শিল্পযাত্রারও এক ধরনের ফিরে দেখা।”
পুরো মিউরালটি সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে প্রায় ১৫ দিন, তার আগে প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে চলেছে ডিজ়াইন ও নানা স্তরে মতামত বিনিময়। যদিও ধারণা ও ডিজ়াইন সায়নের, এই বিশাল কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে একটি শক্তিশালী দলগত প্রচেষ্টায়। “আমার টিম ছাড়া এই কাজ সম্ভব হত না,” তিনি স্পষ্ট করেন। “আমি ডিজ়াইন করি, কিন্তু একসঙ্গে কাজ করলেই সেটি প্রাণ পায়।”
তবে কাজের পথে বাধাও কম ছিল না। “সবচেয়ে কঠিন ছিল কিছু মানুষের আচরণ,” সায়ন অকপটে বলেন। “অনেকে কাজ চলাকালীনই দেয়ালে প্রস্রাব করত। একজন শিল্পীর কাছে এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। একটা কাজ একবার তৈরি হলে, সেটা নিজের সন্তানের মতো হয়ে যায়।”
তবুও স্থানীয় বাসিন্দাদের পজিটিভ প্রতিক্রিয়া দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। “এলাকার মানুষরা বলছিলেন, আগে এই গলিটা কতটা অসুরক্ষিত আর অস্বস্তিকর ছিল,” সায়ন জানান। “এখন তারা গর্ব অনুভব করেন। কেউ কেউ রাতে দেখার জন্য আলো লাগানোর কথাও ভাবছেন।”
সায়নের কাছে এই প্রকল্পে ‘রঙ’ই সবচেয়ে ব্যক্তিগত উপাদান। “যখন ‘কালার করিডর’ নামটা শুনলাম, বুঝেছিলাম এটা আমার জন্যই,” তিনি বলেন। “আমাকে প্রায়ই বিভিন্ন প্রজেক্ট-এ রঙের ব্যবহার সীমিত রাখতে বলা হয়। এখানে আমাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে—আর সেই স্বাধীনতাই এই কাজে ফুটে উঠেছে।”
কোন কোন খুঁটিনাটি তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
সায়নের উত্তর, “পুরনো লেটার বক্স, প্রেসার কুকার আর সেই দেওয়াল থেকে বেরিয়ে থাকা সেরামিক-এর সুইচগুলো।
এক তরুণ আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, এগুলো কী? সে আগে কখনও পুরানো সুইচ দেখেনি। সেই মুহূর্তটাই বুঝিয়ে দিয়েছে—এই ম্যুরাল কেন ও কতটা জরুরি।”
সায়ন মুখার্জির সঙ্গে এই প্রকল্পে কাজ করেছেন একদল শিল্পী—প্রদীপ সরকার, তুষার অধিকারী, পলাশ পোদ্দার, সায়নদীপ রায়, সুব্রত সরকার, রাহুল জয়সওয়াল, সন্দীপন পাল, সুপ্রিয় মাইতি, সৌমেন মাঝি, বিভাস কোটাল এবং পবিত্র পাত্র।


