Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

দিনে কাগজকুড়ানি, রাতে শিল্পী: সূর্যাস্তের পর রাস্তার ফুটপাথই গ্যালারি, শিল্পী সাগর দাসের

মৈত্রী মজুমদার
এ যেন রাতের অন্ধকারে কোলাব্যাঙ-এর রাজপুত্র হয়ে ওঠার রূপকথা। শহরের দিগন্তরেখায় সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে, দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ততার মাঝখানে গোলপার্কের ফুটপাতে নিজের আবেগকে সযতনে লালন করতে বসেন এক শিল্পী। কখনও তাঁর অনুপ্রেরণা শহর কলকাতা, কখনও বা স্মৃতির ভাঁড়ার থেকে উঠে আসা নানা ছবি।
গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের বাইরে, কয়েক টুকরো ব্যবহার করা কাগজ, ছোট্ট একটি পেন্সিলের টুকরো, আর কখনও ভাঙা ইট হাতে নিয়ে ৪৮ বছরের ফুটপাথবাসী সাগর দাস শুরু করেন তাঁর নৈশ রোজনামচা— রোজগার বা বিশ্রামের নয়, সৃষ্টির।

সাগর পেশায় একজন কাগজ কুড়ানি। শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে তিনি কুড়িয়ে বেড়ান গেরস্থালির ফেলে দেওয়া, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস— প্লাস্টিক, ধাতব বস্তু, ফেলে দেওয়া কাচের বোতল এবং আরও নানা সামগ্রী। নীরবে চলাফেরা করেন তিনি, দিনের আলোয় অধিকাংশ মানুষের চোখেই পড়েন না। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই তিনি হয়ে ওঠেন সম্পূর্ণ এক অন্য মানুষ— সংগ্রাম ও টিকে থাকার কাহিনিতে রঞ্জিত এক শিল্পী।
এই প্রতিবেদক-কে সাগর বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আঁকছি। তখনও দেওয়ালে চক দিয়ে বা যা পেতাম তাই দিয়ে ছবি আঁকতাম। সেই অভ্যাস কোনও দিন যায়নি।” দক্ষিণ কলকাতার এক কামরার বস্তি-বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর কেটে গিয়েছে ২৪ বছর। তরুণ বয়সে, যখন তিনি ছিলেন কলেজের ছাত্র, ধীরে ধীরে নেশা তাঁকে গ্রাস করে, মদ্যপান তাঁর জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়।
সেই নেশাই সবকিছু ছারখার করে দেয়, তিনি রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। পিছনে ফেলে আসেন তাঁর পরিবার— পুলিশকর্মী বাবা, স্ত্রী এবং ছোট্ট কন্যাকে। তাঁদের নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না তিনি, কিন্তু তাঁদের প্রসঙ্গ উঠলেই চোখের কোলে ভেসে ওঠে একফোঁটা জল।

“তখন মদ ছাড়তে পারিনি। সবকিছু নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু স্কেচ করা— সেটা কোনো দিন ছাড়িনি,” বলেন তিনি, কন্ঠস্বরে কোনোরকম তিক্ততা ছাড়াই।
অসংখ্য কষ্টের মাঝেও সাগরের উপস্থিতিতে রয়েছে এক অদ্ভুত শান্তি। তিনি ভিক্ষা চান না, অভিযোগও করেন না। দিনের আলোয় তাঁর সময় কাটে আবর্জনা কুড়িয়ে, আর রাত নামলেই স্মৃতি ও কল্পনার মিশেলে আঁকতে বসেন নানা দৃশ্য।

যে শহর তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে, যে কোনো ভাবেই হোক, বাঁচিয়েও রেখেছে, সেই শহরই তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ছেঁড়া পোস্টার, পুরনো ম্যাগাজিনের পাতা, প্যাকেটের ছাপা ছবি—যা কিছু যা তাঁর মনে আলোড়ন তোলে, তিনি সংগ্রহ করে রাখেন। ছেঁড়া কাপড়ের ব্যাগে সযত্নে জমিয়ে রাখেন সেগুলো।

সন্ধ্যায় বের করে এনে নিজের স্কেচবুকে নিখুঁতভাবে পুনরায় আঁকেন। কখনও পেন্সিল, কখনও ইটের টুকরো, কখনও আবার নখ দিয়েই ফুটিয়ে তোলেন তাঁর শিল্পকর্ম। প্রতিটি ছবিই কাঁচাহাতের টানে তৈরি, অথচ গভীর আবেগে ভরা— তাঁর নিজস্ব জীবন, চারপাশের মানুষ এবং হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের প্রতিফলন যেন সেখানে ধরা পড়ে।
অবাক করার মতো বিষয়, পথচলতি কিছু মানুষ থেমেও যান তাঁর সামনে। কেউ কেউ তাঁর কাজ সম্পর্কে জানতে চান, কেউ বা কিনে নেন এক-দু’টি স্কেচ। সেই অর্থ দিয়েই সাগর কেনেন নতুন স্কেচবুক ও পেন্সিল।
গোলপার্কের বহু মানুষের কাছে তিনি হয়তো কেবলই আর এক গৃহহীন পথবাসী।

কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় রামকৃষ্ণ মিশনের বাইরের সেই ফুটপাতই হয়ে ওঠে তাঁর গ্যালারি—এক এমন জায়গা, যেখানে তার ভাঙাচোরা অতীত, দৈনন্দিন ক্লেশ শিল্পের মধ্যেই খুঁজে পায় স্বস্তি আর নিরাময়।