জর্জিয়ার ভ্লাদিমির মেস্তভিরিশভিলি পদ্ম পুরস্কারে সম্মানিত হওয়া প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিলেন। তাঁকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।
২৫ জানুয়ারি, রবিবার ঘোষিত ২০২৬ সালের পদ্ম পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকায় একটি নাম অনেককেই চমকে দিয়েছে। মেস্তভিরিশভিলিকে মরণোত্তর পদ্মশ্রী প্রদান করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি কোনও আলোচনায় না থাকায় তাঁর নামটি প্রথমে অনেকের কাছেই কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে।
কিন্তু যাঁরা কুস্তি জগতের খোঁজ রাখেন, তাঁদের কাছে এই সম্মান সম্ভবত ভারতের তরফে দেওয়া সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার প্রতীক। কারণ জীবনের শেষ দুই দশক তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ভারতের কুস্তি ও কুস্তিগীরদের গড়ে তোলার কাজে। তাঁর হাত ধরেই ভারত বিশ্ব কুস্তির অন্যতম শক্তিধর দেশে পরিণত হয়। ২০২৫ সালের জুন মাসে তাঁর প্রয়াণ ঘটে।
কে ছিলেন ভ্লাদিমির মেস্তভিরিশভিলি?
জর্জিয়ার এই কুস্তিগির ছিলেন সেই বিরল প্রজাতির মানুষের একজন, যাঁরা জীবনের সমস্তটা একটিমাত্র লক্ষ্যে উৎসর্গ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) ঘরানার কুস্তিতে তিনি ছিলেন এক সুপরিচিত নাম। জর্জিয়া ও সোভিয়েত কুস্তি দলে ইউরোপীয়, বিশ্ব ও অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন তৈরি করার অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি ২০০৩ সালে ভারতে আসেন।
ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের আহ্বানে ভারতীয় কুস্তি দলে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী এবং মেস্তভিরিশভিলির অন্যতম খ্যাতনামা শিষ্য যোগেশ্বর দত্ত এক বিবৃতিতে জানান, এই জর্জিয়ান কোচ কখনও নিজেকে শুধু ম্যাট বা নিজের ঘরে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি রক্ষণাত্মক কুস্তিগীর তৈরি করেছেন এবং তাঁদের কাদার মাটি থেকে আধুনিক ম্যাট কুস্তিতে রূপান্তরের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
“উনি আমাদের লড়তে শিখিয়েছেন,” বলেন যোগেশ্বর দত্ত।
টোকিও ২০২০ অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী বজরং পুনিয়া যোগ করেন, “আজ বিশ্ব কুস্তিতে ভারতের যে সম্মান, তার পেছনে ওঁর অবদান অপরিসীম। জীবনের অন্তত শেষ দুই দশক তিনি ভারতীয় কুস্তিকেই উৎসর্গ করেছিলেন।”
ভারতে আসার পর থেকেই মেস্তভিরিশভিলি কুস্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেন। কুস্তিগীরদের কাছে স্নেহের নাম ‘লাডো’ হিসেবে পরিচিত এই কোচই সুশীল কুমারের হাত ধরে ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে ভারতকে কুস্তিতে দ্বিতীয় অলিম্পিক পদক এনে দেন—একটি ব্রোঞ্জ। এরপর ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে সুশীল কুমারের রুপো ও যোগেশ্বর দত্তের ব্রোঞ্জ পদক আসে। ২০১৬ সালে পুরুষ বিভাগে কোনও পদক না এলেও কুস্তি খালি হাতে ফেরেনি—সাক্ষী মালিক অলিম্পিকে ভারতীয় মহিলা কুস্তিগীর হিসেবে প্রথম পদক জিতে ইতিহাস গড়েন।
রিও অলিম্পিক ২০১৬-র পর জর্জিয়ান কোচের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও তিনি ভারত ছাড়েননি। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (SAI)-এর সোনিপত কেন্দ্র থেকে তিনি চলে আসেন ভারতীয় কুস্তির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে। সেখানেই বজরং পুনিয়া, রবি দাহিয়া ও দীপক পুনিয়ার মতো কুস্তিগীরদের দক্ষতা আরও শানিত করতে থাকেন—যাঁরা সকলেই অলিম্পিক বা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিতেছেন।
অনেক সময় যোগ্য প্রাপ্য সম্মান সময়মতো মেলে না—তবে সময় শেষ পর্যন্ত ভারসাম্য রক্ষা করেই। ভারতীয় কুস্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও মেস্তভিরিশভিলি কখনও দ্রোণাচার্য পুরস্কার পাননি, যা ভারতের কোচদের সর্বোচ্চ সম্মান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য পদ্মশ্রী প্রাপ্ত প্রথম বিদেশি ক্রীড়াব্যক্তিত্ব।
মরণোত্তর এই সম্মানের খবর পেয়ে তাঁর ৩৫ বছর বয়সি ছেলে শালভা মেস্তভিরিশভিলি আবেগে ভেঙে পড়েন। বাবার মৃত্যুর সাত মাস পরেও ভারত যে ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছে, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
শীতল তিবলিসিতে, রবিবার পারিবারিক খামারে ছুটি কাটানোর প্রস্তুতির মাঝেই এই পরিবারটি জানতে পারে তাঁদের প্রয়াত পিতার এই ঐতিহাসিক সম্মানের কথা। “কোভিডের পর যখন তিনি তিবলিসিতে ফিরেছিলেন, একদিনও যায়নি যেদিন তিনি ভারতীয় কুস্তির গল্প বলেননি। ভারত কখনও তাঁকে ছেড়ে যায়নি।”– বাবার ভারতবাসের স্মৃতি রোমন্থন করে শালভা বলেন।


