কলকাতার চৈতালি দাসের নাম আজ শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও পরিচিত। পাট শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে অনেকেই ডাকেন ‘জুট কুইন’। একসময় যে পাট শিল্প ছিল বাংলার অর্থনীতির প্রাণভোমরা, সেই সোনালি আঁশকে আবার নতুন করে গ্ল্যামারাস ও বিশ্বমুখী করে তুলতেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
একসময়ের মিসেস ইন্টারন্যাশনাল প্যাজেন্ট জয়ী, বছর পঞ্চাশের চৈতালি দাস বেড়ে উঠেছেন পশ্চিমবঙ্গে—যে রাজ্য ভারতের মধ্যে পাট উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয়। ছোটবেলা থেকেই সমাজ ও পরিবেশের জন্য কিছু করার তাগিদ তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। সেই লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি গড়ে তোলেন তাঁর সংগঠন রক্ষক ফাউন্ডেশন।
রক্ষক ফাউন্ডেশনের অধীনে চৈতালি শুরু করেন এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ—‘জুট স্টোরি: বিয়ন্ড বার্স’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অসমের কারাগারগুলির বন্দিদের পাটজাত সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, এই উদ্যোগ থেকেই জন্ম নেয় একটি পাটভিত্তিক স্টার্টআপ—‘রুট টু জুট’, যার তৈরি পাটের পণ্য আজ কানাডা, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মতো দেশে বিক্রি হচ্ছে।
চৈতালি বলেন, “পাট পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং সহজলভ্য এক বিকল্প। এটি শুধু পরিবেশের উপকারই করে না, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও সমৃদ্ধ করে। আমার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আমি একদিকে যেমন বন্দিদের স্বাবলম্বী করতে চাই, তেমনই সাসটেনেবল উন্নয়নকেও এগিয়ে নিতে চাই।”
কলকাতার আলিপুরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা চৈতালির, শৈশব ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রমী। তাঁর বাড়ি ছিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ও প্রেসিডেন্সি কারেকশনাল হোমের মাঝামাঝি এলাকায়। এই অদ্ভুত পরিবেশ তাঁর মননে গভীর ছাপ ফেলে।
“বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী, তাই এই এলাকায় বাড়ি হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না,” স্মৃতিচারণা করেন চৈতালি। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে যাওয়া, পুলিশ স্টেশন দেখা, আর বিশাল কারাগারের দেয়াল—সব মিলিয়ে বন্দিদের জীবন সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল ক্রমশ বাড়তে থাকে।
রাতে বাড়ির কাছে থাকা চিড়িয়াখানা থেকে ভেসে আসা বাঘের গর্জন, আবার গভীর রাতে পুলিশি জেরার সময় শোনা মানুষের আর্তচিৎকার—এই সব শব্দ অন্য শিশুদের ভয় পাইয়ে দিলেও চৈতালির মনে জাগিয়েছিল সহানুভূতি।
তিনি বলেন, “এই আওয়াজগুলো আমাকে ভয় দেখায়নি, বরং কষ্ট দিয়েছে। ওদের জীবন কেমন, সেটা জানার আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল।”
শৈশবের একটি বিশেষ ঘটনা আজও চৈতালির মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে তিনি একদিন আদালতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেন, পুলিশের ভ্যানে করে কয়েকজন অভিযুক্তকে নামানো হচ্ছে—হাতকড়া পরানো, কোমরে মোটা দড়ি বাঁধা।
“আমি বাবার এক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওরা কারা। বলা হয়েছিল, এরা অপরাধ করেছে, তাই শাস্তি পেতে এসেছে,” বলেন চৈতালি।
তিনি দেখেছিলেন, অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা ছুটে এসে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। সেই দৃশ্য ছোট্ট চৈতালির মনে গভীর আলোড়ন তোলে।
“ওদের পরিবারের কষ্ট দেখে মনে হয়েছিল, আমাকে কিছু একটা করতেই হবে,” বলেন তিনি। সেই ছোট্ট বয়সেই চৈতালি সিদ্ধান্ত নেন—তিনি সমাজকর্মী হবেন, মানুষের জন্য কাজ করবেন। দীর্ঘ কয়েক বছর বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কাজ করার পর ২০১৫ সালে চৈতালি প্রতিষ্ঠা করেন রক্ষক ফাউন্ডেশন। এই সংস্থার মূল লক্ষ্য—পুরুষ ও মহিলা বন্দি এবং সমাজের প্রান্তিক মহিলাদের ক্ষমতায়ন।
শুরুটা হয় কারেকশনাল হোমে স্পোকেন ইংলিশ শেখানোর মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিস্কুট তৈরি, যোগব্যায়াম(বিশেষত কোভিড-১৯ অতিমারির সময়), কাঠের কাজ, চিত্রাঙ্কনসহ নানা প্রকল্প। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফ্যালে ‘জুট স্টোরি বিয়ন্ড বার্স’।
চৈতালি জানান, “ভারতে, বিশেষ করে বাংলায়, প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ পাট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। আমরা বন্দিদের দিয়ে পাটের পণ্য তৈরি করিয়েছি এবং সেগুলি দেশ-বিদেশের নানা প্রদর্শনী ও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছি।”
এই প্রশিক্ষণ ও ইনকিউবেশনের জন্য তিনি যুক্ত হন ন্যাশনাল জুট বোর্ড অব ইন্ডিয়া (এনজেবি)-র সঙ্গে।
৪৫ দিনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রথমে দমদম সেন্ট্রাল কারেকশনাল হোমে বন্দিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হয়, নিয়মিত উৎপাদন ও বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের পথ খুলে যায়।
পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে প্রথমদিকে বিনামূল্যে উপহার দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়, যাতে মানুষ পাটের পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে আগ্রহী হন।
এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩,০০০ জন বন্দিকে পাটের পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এটি রূপ নেয় ‘রুট টু জুট’ স্টার্টআপে, যা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) দ্বারা ইনকিউবেটেড। মেয়াদ শেষে মুক্তি পাওয়া অনেক বন্দিই আজ চৈতালির স্টার্টআপে কর্মরত, সাপ্লাই চেন ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন।
‘রুট টু জুট’-এর তৈরি পণ্যের মধ্যে রয়েছে হস্তশিল্প, কার্পেট ও হ্যান্ডব্যাগ। ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি চৈতালি ও তাঁর ফাউন্ডেশন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়ে—বিশ্বের বৃহত্তম পাটের ব্যাগ তৈরি করে। ব্যাগটির প্রস্থ ছিল ৩০.৬৮ মিটার (১০০ ফুট ৮ ইঞ্চি) এবং উচ্চতা ২৪.৮৭ মিটার (৮১ ফুট ৭ ইঞ্চি)। তবে আজও যুবসমাজের মধ্যে পাটের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম। তাই তরুণদের কথা মাথায় রেখে বিশেষ নকশা ও ফ্যাশনভিত্তিক উপস্থাপনার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
“কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের কাঁধে পাটের ব্যাগ—এমন দৃশ্য তুলে ধরে আমরা তরুণদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করি,” বলেন চৈতালি। উৎপাদন বাড়লেও তাঁর আশা, আরও বেশি মানুষ পাট ব্যবহার করবেন।
কেন তিনি এই উদ্যোগের জন্য বন্দিদেরই বেছে নিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের উত্তরে চৈতালি বলেন, “সমাজ সাধারণত বন্দিদের শুধু অপরাধী হিসেবেই দেখে। কিন্তু যখন তারাই পরিবেশের জন্য উপকারী পণ্য তৈরি করে, তখন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে।”
তিনি যোগ করেন,
“একটি ইতিবাচক দিশা পেলে তথাকথিত অপরাধীরাও যে বদলে যেতে পারে, সেটাই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে নিরলস কাজ করে চলা চৈতালির ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম ও কঠোর। কমবয়সেই কিডনি ষর অসুখে হারান স্বামীকে, শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই নিজের শরীরে ক্যান্সারের বীজ ধরা পড়ে। ভেঙে পড়ার বদলে নিজেকে আরও ডুবিয়ে দেন কাজে। ২০২৫ এ ক্যান্সারকে হারিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন চৈতালি।
হাফ ম্যারাথন থেকে টেড-এক্স স্পীকার, সবেতেই সমান উৎসাহী চৈতালি,২০২৫ এর বইমেলায় প্রকাশ করেন তার কফি টেবিল বই ‘পাটরানী-দ্য কুইন অব জুট’। সাধারণ পাটকে গ্ল্যামার ও বিশ্বদরবারে তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের জীবন দিয়ে মানুষের মননেও পরিবর্তনের যে বীজ বপন করেছেন চৈতালি দাস—সেটাই তাঁর সাফল্যের সবচেয়ে বড় পরিচয়।


