Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

১৭ বছরের নির্বাণের উদ্যোগ: পুরনো জিন্সের রূপান্তর হচ্ছে গৃহহীনদের একটু উষ্ণতার জন্য

ফেলে দেওয়া পুরনো জিন্সকে স্লিপিং ব্যাগে রূপান্তর করে গৃহহীন মানুষের মধ্যে বিতরণ করছেন দিল্লির ১৭ বছরের কিশোর নির্বাণ সোমানি। তাঁর এই উদ্যোগের নাম ‘জিন্স – ব্লু টু গ্রিন’। দিল্লির বাসিন্দা নির্বাণ প্রমাণ করে দিয়েছেন—সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এগোলে নিজের সামর্থ্যের মধ্যেই যে কোনোভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। এই কিশোর ফেলে দেওয়া জিন্স থেকে স্লিপিং ব্যাগ তৈরি করে শীতের রাতে আশ্রয়হীন মানুষের উষ্ণতার ব্যবস্থা করছেন।
সালটা ২০১৯, দিল্লির স্কুলপড়ুয়া নির্বাণ মনে করতেন, তিনি জল ব্যবহারে যথেষ্ট সচেতন। কিন্তু একদিন রাষ্ট্রসংঘের একটি সামাজিক মাধ্যম পোস্টে তিনি জানতে পারেন—একটি মাত্র জিন্স তৈরি করতে লাগে প্রায় ১০,০০০ লিটার জল। এই তথ্য তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। হিসেব করে দেখেন, তার আলমারিতে থাকা পাঁচটি জিন্স মানেই ৫০,০০০ লিটার জলের ব্যবহার। এই অতিরিক্ত জল ব্যবহারের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যেই তিনি বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা শুরু করেন। তখনই তার নজরে আসে ডেনিম কাপড়ের শক্তি, স্থায়িত্ব ও তাপ নিরোধক বৈশিষ্ট্য। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে কাজে লাগিয়ে দরিদ্র ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য স্লিপিং ব্যাগ তৈরি করবেন।

এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘প্রজেক্ট জিন্স’ —একটি সামাজিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ফেলে দেওয়া ডেনিমকে স্লিপিং ব্যাগে রূপান্তর করে পরিবেশগত ক্ষতি কমানো। ‘প্রজেক্ট জিন্স – ব্লু টু গ্রিন’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। পরবর্তী দুই বছর নির্বাণ স্থানীয় দর্জিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে স্লিপিং ব্যাগের প্রোটোটাইপ তৈরি ও উন্নত করেন। ২০২২ সালে এসে পণ্যটি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়। শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় ১,০০০টি জিন্স সংগ্রহ করে তা স্লিপিং ব্যাগে রূপান্তর করা হয়।
এই সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৯,০০০-এরও বেশি জোড়া জিন্স ল্যান্ডফিলে চলে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে ১০ কোটিরও বেশি লিটার জল সাশ্রয় হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভারতের একাধিক শহর—পুনে, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, দিল্লি ও কলকাতাসহ—প্রায় ২,০০০টি স্লিপিং ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে।

২০২৩ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সেখানকার ক্ষতিগ্রস্তদের কাছেও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে প্রজেক্ট জিন্স। দিল্লিতে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দেশগুলির দূতাবাসের মাধ্যমে স্লিপিং ব্যাগ পাঠানো হয়।
এই উল্লেখযোগ্য কাজের জন্য নির্বাণ পেয়েছেন ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড এবং ২০২৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইয়ং ইকো-হিরো অ্যাওয়ার্ড।

আপনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল? প্রশ্নের উত্তরে নির্বাণ বলেন—
“প্রজেক্ট জিন্সের সঙ্গে যুক্ত থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা—পড়াশোনার দায়িত্ব ও প্রকল্পের কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। একজন স্কুলপড়ুয়া হিসেবে পড়াশোনা আমার সময় ও শক্তির বড় অংশ দাবি করে। একই সঙ্গে প্রজেক্ট জিন্স শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং পরিকল্পনা, সমন্বয় ও বাস্তবায়নের জন্যও প্রচুর সময় দিতে হয়। এই দুই দিক সামলানো অনেক সময়ই কঠিন ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠত। কখনও কখনও দু’দিক থেকেই ডেডলাইন ও কাজের চাপ একসঙ্গে এসে পড়ত।
এ ছাড়া, যুব নেতৃত্বাধীন একটি উদ্যোগ হওয়ায় শুরুতে সমাজের মানুষের বিশ্বাস ও সমর্থন পেতেও সময় লেগেছে।”

নির্বাণ আরও বলেন—
“সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো পরিবেশ সচেতন জীবনযাপনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। সচেতনতা বৃদ্ধি, একটি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। বিভিন্ন আলোচনাসভা, সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং প্রজেক্ট জিন্সের কাজের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু উপকরণই নয়, মানুষের চিন্তাভাবনাকেও ‘আপসাইকেল’ করেছি।”
–” আর স্লিপিং ব্যাগ বিতরণের সময় উপকৃত মানুষের চোখে যে কৃতজ্ঞতা ও স্বস্তি দেখি, তার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।” জানান নির্বাণ।

আপনার এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা কী ? এর উত্তরে নির্বাণ বলেন—
“পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা এবং এর বাসিন্দাদের কল্যাণ নিয়ে গভীর উদ্বেগই আমার প্রধান প্রেরণা। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি ছোট উদ্যোগই গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব আমাদের সকলের। প্রজেক্ট জিন্স সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন—এটা শুধু পরিবেশ সংক্রান্ত প্রকল্প নয়, বরং পরিবর্তনের আহ্বান।
পৃথিবী ও একে অপরের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ আমাকে সচেতনতা ছড়িয়ে যেতে, সাসটেনেবল ভাবনার জন্য কাজ করে যেতে এবং দায়িত্বশীল ও সচেতন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে”।

সবশেষে সমাজের প্রতি এক জোরালো বার্তা দিয়ে নির্বাণ বলেন–
“আমি সবাইকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করব—নিজের কাছে থাকা যে কোনো সম্পদ ও ক্ষমতাকে ইতিবাচক পরিবর্তনের কাজে ব্যবহারের জন্য।

শুধু সরকার বা কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে বসে থাকার সময় আর নেই। এই পৃথিবী আমাদের সবার ঘর, আর এর ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। আমি যখন প্রজেক্ট জিন্স শুরু করি, তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে এটি এত বড় আকার নেবে। ছোট্ট একটি উদ্যোগ, একটি বীজের মতো—যা আজ একটি শক্তিশালী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, ঠিক যেমন একটি বীজ থেকে বিশাল গাছ জন্ম নেয়।
তাই নিজের কাজের প্রভাবকে কখনও ছোট করে দেখা উচিত না।

হোক তা বর্জ্য কমানো, অথবা নিজের অর্জিত জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, কিংবা পরিবেশ সচেতনতার উদ্যোগকে সমর্থন করা—আপনার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যেখানে আছি, যা আমাদের আছে, তা দিয়েই পরিবর্তন শুরু করা সম্ভব। পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা নয়—আমাদেরই হয়ে উঠতে হবে পরিবর্তন।”