Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

গঙ্গার বুকে একাকী যোদ্ধা: ‘ডলফিন ম্যান’ রবীন্দ্রকুমার সিনহার জীবনের গল্প

গঙ্গার শান্ত জলে যখন ভোরের আলো পড়ে, নদীর বুক চিরে ভেসে ওঠে এক নিশ্বাস—একটি গঙ্গার ডলফিন। কিন্তু আজ থেকে চার দশক আগে এই নদীতে এমন দৃশ্যই প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল। তখনই এক মানুষের সচেতন পদক্ষেপ বদলে দিয়েছিল এই জলজ প্রাণীর ভবিষ্যৎ।
তিনি রবীন্দ্র কুমার সিনহা—দেশ-বিদেশে খ্যাত “ডলফিন ম্যান অব ইন্ডিয়া” নামে।
পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা সিনহা প্রথম থেকেই নদীর বাস্তুতন্ত্রের প্রতি গভীর অনুরাগী। তাঁর কাছে নদী শুধুই জলস্রোত নয়—এ ছিল এক জীবন্ত জগৎ, যেখানে মানুষের সহাবস্থান বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা দরকার। আর সেই বোঝাপড়াই তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল অসংখ্য অনিশ্চিত যাত্রায়—নৌকা, বোট এবং কখনও কখনও হাঁটুজল ঠেলে নদীর বুক চিরে ডলফিনের সন্ধানে।
শ্রীমাতা বৈষ্ণোদেবী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য(২০১৯ — ২০২৩) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সিনহা বরাবরই মনে করেন—
“নদীকে বুঝতে হলে নদীর প্রাণীদের বুঝতে হবে।”
গঙ্গা নদী ও নেপালের বেশিরভাগ উপনদীতে তাঁর বিস্তৃত সমীক্ষা দক্ষিণ এশীয় নদী ডলফিনের অবস্থান, আচরণ, বিপদ ও পরিবেশগত চাহিদা নিয়ে তৈরি করে বিশাল বৈজ্ঞানিক নথিপত্র।
এ সময় তিনি দেখতে পান—
অবৈধ শিকার
ডলফিনের তেল দিয়ে মাছ ধরার টোপ তৈরি
দূষণ
আবাসস্থল ধ্বংস
এইসব কারণে প্রাণীটি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তখনই শুরু হয় তাঁর নিরবচ্ছিন্ন লড়াই।
ডলফিন শিকারের মূল কারণ ছিল—ডলফিনের দেহ থেকে পাওয়া তেল।
কিন্তু মানুষকে পরিবর্তন না করলে এই প্রাণীকে বাঁচানো সম্ভব নয়—সেটা বুঝতেই সিনহা এগিয়ে এলেন এক অভিনব সমাধান নিয়ে।
তিনি আবিষ্কার করেন—
মাছের উচ্ছিষ্ট দিয়ে তৈরি একটি কার্যকর বিকল্প আকর্ষণকারী টোপ।
জেলেদের হাটে, নদীর ঘাটে, মাঝিদের বাড়িতে—তিনি নিজে গিয়ে হাতে-কলমে শেখান টোপটির ব্যবহার।
ফলাফল?
ডলফিন শিকার দ্রুত কমে যায়, এবং নদীর বুকে বাড়তে থাকে নবজাগরণের আশা।
২০০৯ সালে ভারত সরকার গঙ্গার ডলফিনকে ‘ন্যাশনাল অ্যাকোয়াটিক অ্যানিমল’ ঘোষণা করে।
এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল সিনহার বছরের পর বছরের ফিল্ড রিসার্চ, সমীক্ষা, রিপোর্ট, ডেটা এবং জনসংযোগ।

পরিবেশমন্ত্রী থেকে পরিকল্পনা কমিশন—সবার মনেই তৈরি হয় সচেতনতা।
পরিকল্পনা কমিশনের উপ-চেয়ারম্যান মন্টেক সিং আহলুওয়ালিয়া এমনকি তাঁর সঙ্গে ডলফিন ওয়াচিং–এ অংশ নেন। পরে পাটনায় ন্যাশনাল ডলফিন রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেন। যা দেশের প্রথম ডলফিন রিসার্চ সেন্টার।

এর পাশাপাশি বিহারে, ভাগলপুরের অদূরে গড়ে উঠেছে, বিক্রমশিলা গ্যানজেটিক ডলফিন স্যাংচুয়ারী। যা দেশের প্রথম ও একমাত্র এরকম সংস্থা।
সিনহার কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে।
তিনি সদস্য হয়েছেন—আইইউসিএন (Geneva), লন্ডনের লিনিয়ান সোসাইটির। এশিয়ান রিভার ডলফিন কমিটির চেয়ারম্যানও তিনি।

১০০টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ, চারটি বই এবং ৪০টিরও বেশি কারিগরি রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন।
২০০১ সালে তিনি ভারতের ইতিহাসে প্রথম গর্ভবতী ডলফিন উদ্ধার ও স্থানান্তর করেন—সংরক্ষণ আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ডলফিন সংরক্ষণ নিয়ে বিশ্বদর্শকের সামনে তাঁর কণ্ঠস্বর
তুলে ধরতে ২০০৭ সালে নির্মিত হয়েছে দুটি ডকুমেন্টারি—
Alert on the Ganges
Mr. Dolphin Sinha: Think Globally and Act Locally
তাঁর গবেষণা ও আন্দোলনকে এই দুই তথ্যচিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে।
২০১১ সালের ৮ মার্চ রাজ্যসভায় পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ বলেন—
“ভারতে ডলফিন গবেষণার শীর্ষ কর্তৃপক্ষ হলেন প্রফেসর আর. কে. সিনহা—‘ডলফিন সিনহা’। তাঁর মতো মানুষের জন্যই আমরা গঙ্গার ডলফিনকে ফিরিয়ে আনতে পারছি।”
পুরস্কার, সম্মাননা পেয়েছেন অনেক—অর্ডার অব দ্য গোল্ডেন আর্ক, নেদারল্যান্ডস – ১৯৯৯, গোল্ডেন জুবিলি অ্যাওয়ার্ড, ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস – ২০০০, পদ্মশ্রী, ভারত সরকার – ২০১৬, ফর্শ সে অর্শ তক, আউটলুক ম্যাগাজিন – ২০১৯, এলিট অ্যাকাডেমিশিয়ান অ্যাওয়ার্ড, IEEE USA – ২০২২।

কিন্তু তাঁর কাছে নদীর ডাকের টান অনেক বেশি, তাই এই সব সম্মাননাও তাঁর আসল পরিচয় নয়। তাঁর আসল পরিচয়—গঙ্গার ডলফিনকে বাঁচানোর মানচিত্র হাতে এক দৃঢ় বিজ্ঞানী।
আজও চলেছে তাঁর সংগ্রাম।
গঙ্গার ডলফিন শুধু এক প্রাণী নয়—এ দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, পরিবেশগত সুস্থতার প্রতীক। আর তারাই বেঁচে আছে আজ—এক মানুষের অধ্যবসায়, বিজ্ঞান ও অবিশ্বাস্য মানবিকতার কারণে।
রবীন্দ্র কুমার সিনহা আজও মনে করিয়ে দেন—“নদীকে বাঁচানো মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।”