বাঙালি ডাঃ রতনচন্দ্র কর, এঁর জন্যই একসময় বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল আন্দামানের জারোয়া জনজাতি।
প্রথম জীবনে তিনি নাগাল্যান্ডে স্থানীয় কান্যাক্ জনজাতির চিকিৎসার কাজে লিপ্ত ছিলেন। তার সেই অভিজ্ঞতা থাকার জন্যই তাকে ১৯৯৮ সালে সরকার থেকে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মেডিক্যাল অফিসার হিসাবে পাঠানো হয় ।
সেখানকার এক প্রত্যন্ত দ্বীপে জারোয়া জনজাতির বহু মানুষেরা সেসময় সংক্রামক ব্যাধি হাম-এ আক্রান্ত হয়েছিল।

জারোয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা সাধারণত বিষাক্ত ধনুক ও তীরে সজ্জিত থাকেন এবং তারা বহিরাগতদের প্রবেশ পছন্দ করতেন না, ফলতঃ সকলেই তাদের চিকিৎসার জন্য সেখানে যেতে ভয় পেতেন।
ডাঃ কর নাগাল্যান্ডে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চ্যালেঞ্জ নিয়ে মধ্য আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে থাকা ৭০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত জারোয়া অধ্যুষিত জঙ্গলে কদমতলা হাসপাতালে যান।

এই সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন দুর্ঘটনায় পা ভেঙে জঙ্গল বিচ্ছিন্ন এক জারোয়া যুবকের চিকিৎসা করে।
সেই জারোয়া যুবক, যাকে তার গ্রামের লোক মৃত বলে ধরে নিয়েছিল, তার ফিরে যাওয়া এবং সভ্য মানুষের ব্যবহার সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার কথা শুনে জারোয়া জনজাতি ডাঃ কর-এর ওপর ভরসা করতে শুরু করে।
তবুও জারোয়াদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয় মাথায় রেখে মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসে ডাঃ কর, তাদের ভাষা শেখেন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাদের সঙ্গে মিশে যান।

তিনি বুঝেছিলেন যে জারোয়া জনজাতির মানুষ, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসতে চাইবে না, তাই তিনি তাদের জন্য কুঁড়েঘর এর মত করেই চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন তাদেরই গ্রামে গিয়ে।
তাদেরকে দিনের পর দিন শুশ্রূষা করে হাম এবং অন্যান্য রোগ থেকে বাঁচিয়ে তোলেন। পরবর্তীতে শুধু রোগ নিরাময় নয়, বিভিন্ন উন্নয়নমুখি পদক্ষেপ নিয়ে বিলুপ্তির হাত থেকেও তাদের রক্ষা করেন।
১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সময়ে জনজাতির সংখ্যার বৃদ্ধি হয়। ২০০৩ সালে তিনি পোর্ট ব্লেয়ারের ফিরে আসেন, কিন্তু জারোয়াদের চিকিৎসার জন্য প্রায়শই প্রত্যন্ত স্থানে চলে যেতেন।
২০০৬ সালে তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রশাসিত প্রশাসনের আদিবাসী কল্যাণ দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর হন ।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের এই জনজাতির উপর তিনি ইংরাজিতে -“দ্য জারোয়াজ্ অফ দ্য আন্দামানস্” ও বাংলাতে – “আন্দামানের আদিম জনজাতি জারোয়া” এই দুটি বই লিখেছেন।
ডাঃ রতনচন্দ্র কর স্থানীয়দের কাছে ‘জারোয়াদের ডাক্তার’ নামে পরিচিত।
জীবনের অর্ধেকের বেশি সময়ই জারোয়া জনজাতির চিকিৎসায় কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার নিরলস প্রচেষ্টার জন্য ভারত সরকার এর পক্ষ থেকে ২০২৩ সালে ডাঃ কর-কে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী প্রদান করা হয়।


