Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

নীল ভুট্টা থেকে দারচিনি-গন্ধী তুলসী: ৫৬০ প্রজাতির বিরল বীজ সংরক্ষণের নায়ক ড. প্রভাকর রাও

বেঙ্গালুরুর কাছে ২.৫ একর প্রাকৃতিক খামারে ফলে রয়েছে এক রঙিন সব্জি-বিশ্ব। এখানে দেখা মেলে বেগুনি, সাদা ও গোলাপি ঢেঁড়স, নীল চিনাবাদাম, আপেলের মতো গোল শসা, এমনকি দারচিনি-গন্ধী তুলসীরও।
এই আশ্চর্য সব্জির জনক হলেন ড. প্রভাকর রাও, যিনি একসময় ছিলেন পেশায় স্থপতি, কিন্তু হৃদয়ে প্রকৃত কৃষক।

কর্মজীবনে অবসর নিয়ে ২০১১ সালে দুবাই থেকে দেশে ফেরার পর তিনি কৃষিতে মনোনিবেশ করেন। তখনই শুরু হয় তাঁর বিরল ও বিপন্ন বীজ সংরক্ষণ অভিযান।


ড. রাও প্রতিষ্ঠা করেন ‘হরিয়ালী সিডস’, একটি পারিবারিক খামার যা সারা বিশ্ব থেকে বিলুপ্তপ্রায় ও ঐতিহ্যবাহী বীজ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ ও বিক্রি করে।

ভারতের জলবায়ুতে তিনি সফলভাবে ১৪২ প্রজাতি অভিযোজিত করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে—
জাপানের ‘কামো’ বেগুন
অন্ধ্রের ‘দোসাকাই’ গোল শসা
মোলডাভিয়ার ল্যাভেন্ডার-গন্ধী ভেষজ
এবং অতি মিষ্টি চিলি পেপার
তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট — “যতদিন অন্তত একজনও উদ্যানপালক এই বীজ রোপণ করবেন, ততদিন প্রজাতিগুলো পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে।”


“গত দুই দশকে দেশে সব্জির বৈচিত্র্য ভয়াবহভাবে কমে গেছে,” বলেন ড. রাও।
“আজ ৯০ শতাংশ সবজিই হাইব্রিড। বীজ কোম্পানির ব্যবসায়িক নীতি কৃষকদের প্রতি মরসুমে নতুন বীজ কিনতে বাধ্য করছে। ফলে শত শত দেশী সব্জির প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “যখন কোনও প্রাণী প্রজাতি বিপন্ন হয়, সারা বিশ্ব উদ্বিগ্ন হয়। কিন্তু সব্জির বিলুপ্তি নিয়ে কেউ ভাবে না। অথচ দেশি প্রজাতিগুলোই জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও রোগ প্রতিরোধে প্রকৃত সক্ষম।”
ড. রাওর বীজ সংগ্রহের পরিধি ছড়িয়ে রয়েছে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের দুর্গম অঞ্চলে।

তিনি জানান, “এইসব অঞ্চলে এখনো কিছু পুরনো প্রজন্মের কৃষক আছেন, যাঁদের কাছে রয়েছে দুর্লভ জাতের পুরনো বীজ।”

একবার পশ্চিমবঙ্গে ভ্রমণে এসে তিনি এক কৃষকের কাছ থেকে উদ্ধার করেন বাংলাদেশি লম্বা বেগুনের বীজ, যা ১৫ বছর ধরে বাজারে অনুপস্থিত ছিল। এখন তাঁর কাছে আছে প্রায় এক হাজার সেই বীজ।
“আমরা একসময় সবুজ বিপ্লবের অংশ ছিলাম,” স্মৃতিচারণ করেন ড. রাও।


“রাসায়নিক সার, বোরওয়েল, কীটনাশক—সবই প্রচার করেছি। কিন্তু মনে সবসময় প্রশ্ন ছিল, এটি কি পরিবেশবান্ধব ?”
এই আত্মসমালোচনা থেকেই তিনি স্থাপত্যে পড়াশোনা করতে যান লুইজিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য বিভাগে কাজ শুরু করেন।

তবে কৃষির প্রতি তাঁর টান কখনও কমেনি।

আজ তাঁর খামারে নিয়মিত ওয়ার্কশপ ও শিক্ষামূলক সফর আয়োজন করা হয়, যেখানে মানুষ শেখে বীজ বপন, বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক চাষের কৌশল। তাঁর সঙ্গে আছেন তিনজন সহকারী এবং তাঁর পুত্র, যিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন।

“দেশি বীজ সংরক্ষণ আমার কাছে কাজ নয়, এটি আমার ভালোবাসা,” বলেন ড. রাও।
“প্রতিদিন খামারে কিছু না কিছু নতুন ঘটে—এই উৎসাহই আমার জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।”