Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

হস্তি কন্যা’র কাহিনি, ভারতের প্রথম মহিলা মাহুত পার্বতী বড়ুয়া

ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন ১৩২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। এর মধ্যে ছিলেন এক অনন্যা নারী—অসমের পার্বতী বড়ুয়া, যিনি দেশের প্রথম মহিলা মাহুত হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।

‘হস্তি কন্যা’ নামে খ্যাত এই সাহসিনী জীবনের প্রতিটি দিন উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রিয় হাতিদের জন্য।
পার্বতী বড়ুয়া, বর্তমানে সত্তরের কোঠায়, জন্ম ও বেড়ে ওঠা অসমের গৌরীপুরের রাজপরিবারে। তাঁর পিতা, প্রয়াত প্রকৃতীশচন্দ্র বরুয়া, ছিলেন গৌরীপুরের শেষ রাজা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন হস্তি-বিশারদ ।
বিশাল রাজপরিবার, ঐশ্বর্য, নয় ভাই বোন ইত্যাদির মধ্যে বেড়ে উঠলেও শৈশবেই পুতুল খেলার চেয়ে প্রকৃতি আর বন্যপ্রাণীর প্রতি আকর্ষণ বেশি ছিল পার্বতীর। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরেই তিনি হাতিদের সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন।


মাত্র ১৪ বছর বয়সে, কোকরাঝার জেলার কচুগাঁও এর জঙ্গলে নিজের হাতে প্রথম হাতিটিকে বন্দি করেন তিনি। সেই মুহূর্তটিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৭২ সালে সকল সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে পার্বতী মাহুত হিসেবে কাজ শুরু করেন—যা তখন একেবারেই পুরুষপ্রধান পেশা ছিল। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর আজীবনের হাতি-যাত্রা।

প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় তাঁর কাজ—হাতিদের স্নান করানো, জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়া। নিজের হাতে তৈরি করেন হাঁড়িয়া(চালের তৈরি দেশি মদ), যা তাঁর প্রিয় হাতিদের বড়ই পছন্দ।
ইন্ডিয়া টুডে-কে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ওরা আমাকে ভালোবাসে কারণ আমি ওদের মনের ভাষা বুঝি। আমার এক ডাকে ওরা ছুটে আসে।”

পার্বতীর তিন প্রিয় ‘হাতি-কন্যা’ আছে—লক্ষ্মীমালা, আলোকা ও কঞ্চনমালা। এই তিন সঙ্গিনীর সঙ্গে তিনি ও তাঁর দলের সহযাত্রীরা মিলে বনের অজানা পথে জীবন কাটান। তিনি বলেন, “আমার পেশায় রিটেক বলে কিছু নেই। প্রতিবার জঙ্গলে গেলে মনে হয়, এটাই হয়তো শেষ যাত্রা। কিন্তু মাহুত কখনও অবসর নিতে পারে না।”
বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের রাজ্য প্রশাসন আজও তাঁর সাহায্য নেয় বন্য হাতি উদ্ধার বা আহত হাতির সেবায়। একবার এ রাজ্যের মেদিনীপুরে এক অভিযানে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যখন ৫০টি হাতির পাল পথ হারিয়ে বিধ্বংসী হয়ে উঠেছিল। নিজের তিন হাতি ও মাহুত দলের সঙ্গে পার্বতী দুই সপ্তাহের চেষ্টায় সেই হাতিদের নিরাপদ ঘরের পথে ফেরান।

রাজপরিবারের সবার ছোট আদরের রাজকুমারী, এককালের ডাকসাইটে অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়ার ভাইঝি, জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী খ্যাতনামা লোকসঙ্গীত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়া পান্ডের বোন হয়েও পার্বতীর জীবন আজও সরল ও সংযমী।
আধুনিক জীবনযাপনের আরামের দিকটি প্রয়োজনীয় মনে করেন না তিনি। টুথপেস্টের বদলে আজও ব্যবহার করেন ছাই, ঘুমোন জঙ্গলের তাঁবুতে, পুরনো বিছানায়। পাশে থাকে তাঁর প্রিয় সরঞ্জাম—দড়ি, চেন, কুকরি (তীক্ষ্ণ ছুরি) আর জিন।

বিবিসি তাঁর জীবনের ওপর নির্মাণ করেছে ডকুমেন্টারি “কুইন অফ দ্য এলিফ্যান্টস”, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।

ফার্স্ট পোস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের হাতি-প্রীতির কারণ জানাতে গিয়ে পার্বতী বলেন, “ভালোবাসা বোঝানো যায় না। হয়তো কারণ হাতিরা ধীর-স্থির, অনুগত, স্নেহশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ—তাই ওদের প্রতি আমার এত টান।”

পার্বতী বরুয়া—এক নারী, যিনি প্রমাণ করেছেন ভালোবাসা ও সাহসের মিলনেই গড়ে ওঠে কিংবদন্তি।