কানপুর, উত্তর প্রদেশ। যেখানে সমাজের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে খোলা স্থানে মলত্যাগকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল, সেখানেই এক নারী ইট, বালি আর সিমেন্টকে অস্ত্র বানিয়ে শুরু করেছিলেন নীরব এক বিপ্লব। তাঁর নাম—কলাবতী দেবী।
জন্ম ষাটের দশকে, আজ তিনি পরিচিত ‘টয়লেট দিদি’ নামে। কানপুরের বস্তি অঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তর ভারতের নানা প্রান্তে শৌচাগার নির্মাণ করে তিনি বদলে দিয়েছেন হাজারো মানুষের জীবন।
২০১৯ সালে এই অসামান্য মানবসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের সর্বোচ্চ নারী সম্মান ‘নারী শক্তি পুরস্কার’ পান কলাবতী দেবী।
সীতাপুরের মেয়ে কলাবতী যখন মাত্র ১৪ বছরের, তখন তাঁর বিয়ে হয় কানপুরের জে. কে. মন্দির সংলগ্ন রাজা পুরওয়ায় ১৮ বছর বয়সি জয়রাজ সিংহের সঙ্গে। স্বামী তখন ‘শ্রমিক ভারতী’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় ফ্লোর কাটার হিসেবে কাজ করতেন।

বিয়ের পর নতুন জীবনে প্রবেশ করেই কলাবতী দেখেন—এলাকাজুড়ে রাস্তায় মলত্যাগের বীভৎস দৃশ্য। তাঁর নিজের ভাষায়, “এটা ছিল এক জীবন্ত নরক।” সেই নরক থেকে মানুষকে মুক্ত করার সংকল্প নেন তিনি।
স্বামীর সহায়তায় ‘শ্রমিক ভারতী’র কাছে প্রস্তাব রাখেন—একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক শৌচাগার নির্মাণের। সংস্থাটি প্রথমে ১০ থেকে ২০ আসনের শৌচাগার গড়ার পরিকল্পনা করে। কর্পোরেশন জানায়, যদি কলাবতী ১ লক্ষ টাকা তুলতে পারেন, তারা ২ লক্ষ টাকা দেবে।
অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় তিনি অর্থ সংগ্রহ করেন, সমাজে ছড়িয়ে দেন সচেতনতার বার্তা। ফলস্বরূপ, রাজা পুরওয়ায় গড়ে ওঠে ৫০ আসনের শৌচাগার—যা শুধু পরিকাঠামো নয়, মানুষের মানসিকতারও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু সংগঠক হয়ে থেমে থাকতে চাননি কালাবতী। তিনি নিজেই শৌচাগার নির্মাণের প্রশিক্ষণ নেন এবং রাজমিস্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ‘শ্রমিক ভারতী’ তাঁর প্রশিক্ষণের ব্যয়ভার বহন করে।
এক নারী নির্মাণশিল্পীর হাত ধরে এভাবেই শুরু হয় ভারতের এক নতুন অধ্যায়—যেখানে উন্নয়নের মূলে ছিল নারী শ্রম, মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস।
কিন্তু ভাগ্য সহজ ছিল না। হঠাৎই স্বামী ও জামাই—দুজনেরই অকাল মৃত্যু হয়। তখন কলাবতীর একার ওপরেই মেয়ে ও দুই নাতির দায়িত্ব এসে পড়ে। তবু থেমে যাননি; কাজ চালিয়ে গেছেন আরও দৃঢ়তায়।
কাজের সন্ধানে ২০১৫ সালে কালাবতী দেবীর পৌঁছান কানপুরের রাখি মাণ্ডি বস্তিতে—যেখানে ৭০০ টি পরিবার বাস করত, কিন্তু একটিও শৌচাগার ছিল না। এলাকায় খোলা নালা, দুর্গন্ধ, রোগব্যাধি, এমনকি শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের খবরও ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা।
কালাবতী ‘ওয়াটারএইড’ সংস্থাকে এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে রাজি হননি। তারা জমি দিতে বা অর্থ সাহায্য করতে অস্বীকার করে, কারণ সন্দেহ করেছিল, সাহায্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য উদ্দেশ্য।

তবু তিনি হাল ছাড়েননি। শৌচাগার তৈরীর প্রচেষ্টায় দুই বাস বদলে প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার হাঁটতেন, কখনও মুষলধারে বৃষ্টিতেও।
তাঁর একাগ্রতা ও মানবিকতা ধীরে ধীরে এলাকার মানুষের আস্থা ফেরায়। শেষমেশ, সেই রাখি মাণ্ডিতেও নির্মিত হয় শৌচাগার—নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার এক নতুন অধ্যায়।
কালাবতী দেবীর কাজ জাতীয় স্বীকৃতি পায় ২০১৯ সালে, যখন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাঁর হাতে তুলে দেন ‘নারী শক্তি পুরস্কার’। ভারতের বারোজন বিশিষ্ট নারী সেই বছর এই সম্মান পান, তাঁদের মধ্যে কালাবতী ছিলেন এক উজ্জ্বল নাম।
২০২০ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট তুলে দেন সাতজন নারীকে—যাদের তিনি নাম দেন “দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন”। তাঁদের মধ্যেও ছিলেন কালাবতী দেবী যিনি প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে ট্যুইট করেছিলেন।
আজ কালাবতী দেবীর হাতে নির্মিত প্রায় ৪,০০০টি শৌচাগার শুধু পরিকাঠামো নয়—এটি নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি। তাঁর গল্প প্রমাণ করে, সমাজ পরিবর্তনের শক্তি ক্ষমতায় নয়, ইচ্ছাশক্তিতে নিহিত।
যেমন তিনি বলেন—
“শৌচাগার মানে শুধু ইট আর সিমেন্ট নয়, এটি মানুষের সম্মান ও জীবনের মর্যাদার প্রতীক।”
কালাবতী দেবী—ভারতের সেই অনন্য নারী, যিনি অস্ত্র ছাড়াই লড়ে গেছেন নিজের বিপ্লব। তাঁর গল্প, এক নারীর নয়—এক জাতির জেগে ওঠার গল্প।


