Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

ভারতের বীজযোদ্ধা — সালাই অরুণের ৮০,০০০ কিলোমিটার জীবনরক্ষার মহাযাত্রা

তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লির ছোট্ট গ্রাম মঙ্গলম থেকে উঠে আসা এক কৃষক আজ দেশের কৃষি ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি সালাই অরুণ — যিনি নিজের দুঃখকে রূপ দিয়েছেন স্বপ্নে, আর নিজের ক্ষেতকে পরিণত করেছেন জীবনের আশ্রয়ভূমিতে।

মায়ের মৃত্যুতে অল্প বয়সে অনাথ হয়ে পড়েছিলেন অরুণ। দাদু-দিদার স্নেহে বড় হলেও তাঁরা চেয়েছিলেন, নাতি যেন কৃষির কঠোর পরিশ্রম থেকে দূরে থাকে। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল।
একদিন তাঁর দেখা হয় তামিলনাড়ুর প্রখ্যাত জৈব কৃষি-বিজ্ঞানী জি. নাম্মালভার-এর সঙ্গে। সেই সাক্ষাতই বদলে দেয় জীবনের গতিপথ। নাম্মালভারের কাছ থেকে অরুণ শিখে নেন ভারতের প্রাচীন কৃষি-জ্ঞান, মাটির সঙ্গে মানুষের চিরন্তন সম্পর্ক, আর সেই জ্ঞানের পুনর্জাগরণের মন্ত্র।

তারপর তাগিদ এল সেই প্রাচীন কৃষিসংস্কৃতির কাছে পৌঁছানোর।
২০২১ সাল। হাতে মাত্র ৩০০ টাকা আর হৃদয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সালাই অরুণ শুরু করেন এক অকল্পনীয় অভিযাত্রা—ভারতের নানা প্রান্ত ঘুরে ৮০,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বীজযাত্রা। সারাদেশের গ্রাম, ক্ষেত, হাটবাজার ঘুরে তিনি সংগ্রহ করেন ৩০০-রও বেশি বিরল দেশি বীজ, যেগুলির অনেকই বিলুপ্তির পথে। লাউ, বরবটি, ঝিঙে, শিম—এই পরিচিত ফসলগুলোরও অনেক প্রজাতি ছিল যেগুলো হারিয়ে যাওয়ার মুখে। সেসবের বীজ সংগ্রহ করতে থাকেন তিনি।


তাঁর এই সংগ্রহ কেবল কৃষিবৈচিত্র্য নয়, ভারতের প্রাচীন কৃষিসংস্কৃতির পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে ওঠে।
অভিযান শেষে নিজের গ্রামে ফিরে এসে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এক ব্যতিক্রমী প্রকল্প — ‘করপগথরু’ ।
এই উদ্যোগ আজ ভারতের জীববৈচিত্র্যের এক জীবন্ত আর্কাইভ, যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে ৩০০-রও বেশি দেশি বীজের জাত।

অরুণ শুধুমাত্র সংরক্ষণেই থেমে থাকেননি — তিনি কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে এই বীজ বিতরণ শুরু করেন, যাতে এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাটিতে বেঁচে থাকে।
সালাই অরুণের সংগ্রহ কেবল বীজের নয়, এটি জীবন, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সংরক্ষণ। প্রতিটি বীজের পেছনে রয়েছে একেকটি গল্প — কোনও কৃষকের সংগ্রাম, কোনও মাটির গান, কোনও প্রাচীন প্রজাতির টিকে থাকার আশা।

তাঁর প্রচেষ্টা আজ কৃষি আন্দোলনের সীমা পেরিয়ে দাঁড়িয়েছে এক জীবনদর্শন হিসেবে — যেখানে মাটি মানেই জীবন, আর প্রতিটি বীজ মানেই ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।