২০ বছরের এক যুবক, মুম্বইয়ের পারেল অঞ্চলে লাইব্রেরি চালাতেন।
উল্টোদিকেই ছিল বিখ্যাত টাটা ক্যান্সার হাসপাতাল।
ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পথচারীদের ভিড়ের দিকে চেয়ে থাকতেন। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীদের মুখের ভয়ের ছাপ, তাদের আত্মীয়-স্বজনদের অসহায় ছুটোছুটি — এগুলো যুবকটির মনকে ভীষণ ব্যথিত করত।
অধিকাংশ রোগীই ছিল বাইরে থেকে আসা দরিদ্র গ্রামাঞ্চলের মানুষ। তারা জানতই না কাকে গিয়ে ধরবে, কী করবে। ওষুধ-পানীয়ের তো প্রশ্নই নেই, তাদের কাছে খাওয়ার জন্যও টাকা থাকত না সবসময়।

এই দৃশ্য দেখে যুবকটি প্রতিদিন ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাড়ি ফিরতেন। বারবার তার মনে আসত একটাই কথা —“এই মানুষগুলোর জন্য কিছু একটা করা উচিত!”
দিন-রাত সে এই ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে অবশেষে একদিন সমাধান খুঁজে পেলেন তিনি।
নিজের ভালো চলতি সফল হোটেল ভাড়া দিয়ে, কিছু টাকা জোগাড় করে টাটা হাসপাতালের সামনে কন্দাজি চৌল-এ নিজের কর্মযজ্ঞ শুরু করলেন।
তখনও তিনি জানতেন না, এই যজ্ঞ অনবরত চলবে টানা ৩৭ বছর!
— হরখচাঁদ সাভলার এই সেবাযাত্রা আজও অনুপ্রেরণার প্রতীক
মাত্র ২০ বছর বয়সে মানবতার এক দীপ্ত অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন হরখচাঁদ সাভলা। আজ ৫৭ বছর বয়সেও সেই একই উদ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘জীবনজ্যোত ট্রাস্ট’ বর্তমানে সারা দেশে ১২টি কেন্দ্রের মাধ্যমে ৬০টিরও বেশি মানবিক প্রকল্প পরিচালনা করছে — যার মধ্যে মুম্বই, জালগাঁও, সাংলি ও কলকাতার কেন্দ্রগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শান্ত ও স্থির মনের মানুষ সাভলা সর্বদাই মানবিকতা ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, তাঁর স্ত্রীর অবিচল সহযোগিতা ও প্রেরণাই তাঁর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। পারিবারিক জীবন, ব্যবসা এবং সমাজসেবার মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখে চলাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর মমতা ছিল দরিদ্র মানুষের প্রতি। স্কুলের এক সহপাঠীর টিউশন ফি দিতে একসময় নিজের বাসভাড়ার টাকা বাঁচাতেন তিনি।
তাঁর বিশ্বাস, “সমাজ আমাদের যা দিয়েছে, তা সমাজকেই ফিরিয়ে দিতে হবে।”
যৌবনে তিনি এলাকায় একটি সমাজকল্যাণ সমিতি গঠন করেন। রক্তদান শিবির, বিনামূল্যে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা, এবং পরিত্যক্ত মৃতদেহের সৎকারের মতো নানা উদ্যোগে তখন থেকেই যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর এই দূরদর্শিতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীতে ‘জীবনজ্যোত ট্রাস্ট’-এর ভিত্তি স্থাপন করে।
লোয়ার পারেলে একসময় তিনি একটি গ্রন্থাগার পরিচালনা করতেন। সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে চিন্তার গভীরে নিয়ে যায়। এই সময় থেকেই কিছু মানুষ তাঁর পরামর্শ নিতে আসেন, আর সেই সূত্রেই তিনি প্রথম দেখেন টাটা ক্যান্সার হাসপাতালের নির্মম বাস্তবতা।

সফল ব্যবসায়ী হয়েও হাসপাতালের গেটের সামনে মৃত্যুর প্রহর গোনা রোগী ও তাঁদের হতভাগ্য স্বজনদের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই দৃশ্যই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় — তিনি বুঝতে পারেন, প্রকৃত সন্তুষ্টি শুধুই সেবায়।
প্রথমে কান্দাজি চৌল-এ শুরু করলেও পরে বিল্ডিংয়ের পাশে শুরু করেন এক ছোট্ট সেবাকেন্দ্র। সেখানে ক্যান্সার রোগী ও দরিদ্র মানুষদের দেওয়া হত বিনামূল্যে ওষুধ, খাবার, থাকার জায়গা ও পরামর্শ।
শুরুটা ছিল মাত্র ৫০ জন নিয়ে, কিন্তু অল্প সময়েই সেই সংখ্যা ১০০, ২০০ হয়ে ৭০০-তে পৌঁছে যায়। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে পুরনো খবরের কাগজ ও কাপড় সংগ্রহ করে ৪০ লক্ষ টাকার তহবিল গঠন করেন — যা সমাজে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
সময় গড়িয়েছে, কিন্তু সাভলার সেবাকর্ম থেমে থাকেনি। তিনি গরিবদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের ‘মেডিসিন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনজন চিকিৎসক ও তিনজন ফার্মাসিস্ট স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিতে তিনি গড়ে তোলেন একটি ‘টয় ব্যাংক’।
বিগত ৩৭ বছর ধরে মুম্বইয়ের শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা — কোনো কিছুই তাঁর সেবাযাত্রাকে থামাতে পারেনি। লক্ষ লক্ষ ক্যান্সার রোগী ও তাঁদের পরিবার আজও মনে করেন, তাঁরা ঈশ্বরকে দেখেছেন হরখচাঁদ সাভলার রূপে।
হরখচাঁদ সাভলা আজ কেবল একজন সমাজসেবক নন, তিনি মানবতার প্রতীক। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় শেখায় — সেবা ও সহমর্মিতার আলোই পারে অন্ধকার জীবনে আশার দীপ জ্বালাতে।
জীবনজ্যোত তাই আজ এক প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এক আলোকবর্তিকা — মানবতার পথপ্রদর্শক।


