১৯৬১ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে ধীরা চলিহা হাজারিকা হয়ে ওঠেন অসমের প্রথম মহিলা পাইলট। যুদ্ধকালীন এয়ারস্ট্রিপ পেরিয়ে একাই উড়াল, ঝড়-ঝঞ্ঝা জয়, আর দুঃসাহসী আকাশ কসরত দেখতে জনতার ভিড়—সবই ছিল তাঁর কীর্তিতে। তাঁকে দেখে মানুষ বলত—“উড়ন্ত অসমিয়া মেয়ে।”
পরিবারের দায়িত্ব তাঁকে একসময় টেনে নেয়, তবে আকাশের প্রতি ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি।
ছয় দশক পর, ৮৫ বছর বয়সে, ধীরা আবার ডানা মেললেন—এবার লন্ডনের টেমস নদীর আকাশে, ভিনটেজ ‘টাইগার মথ’ বিমান চালিয়ে।
অবতরণের পর তাঁর অনুভূতি—“এটা সত্যিই অপূর্ব অভিজ্ঞতা। আমার উড়ানের দিনগুলোর স্মৃতি যেন ঝরঝর করে ফিরে এলো।” এই কীর্তির সাথে সাথে আসামের প্রথম অশীতিপর মহিলা পাইলটের তকমাও পেলেন,ধীরা চলিহা হাজারিকা।
চলুন জেনে নিই তাঁর জীবনের রোমাঞ্চকর কাহিনি।
১৯৪০ সালে জোরহাটে জন্মগ্রহণ করা ধীরা চলিহা হাজারিকার শৈশব কেটেছিল জোরহাট ও গুয়াহাটি জুড়ে। তিনি গুয়াহাটির হান্ডিক কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ছোটবেলা থেকেই ধীরা ছিলেন দারুণ খেলাধুলাপ্রিয়, যা সে সময়ের সমাজে মেয়েদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হতো।
তাঁর শৈশবকে সমাজের বেড়াজাল ঘিরে ধরতে পারেনি, কারণ তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর পিতা কামলেশ্বর চলিহা। তিনি মেয়েকে উৎসাহ দিয়েছিলেন নিজের ইচ্ছেমতো চলতে। ধীরার ও একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন কিছু করা, যাতে তাঁর পিতা গর্বিত হন।
ধীরা প্রায়ই গাছের উঁচু ডালে উঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বার্মা অভিযানে ব্যবহৃত ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানগুলো দেখতেন। সম্ভবত সেই ডালেই জন্ম নেয় তাঁর উড়ানের প্রতি আবেগ। যে সময়ে সমাজ মেয়েদের রান্নাঘরের বাইরে বেরোতে দিত না, সেই সময়ে বিমানে উড়ান ছিল অকল্পনীয়। তবু ধীরার জীবনের নায়ক ছিলেন তাঁর পিতা।

১৯৫৯ সালের এক শীতল দিনে, অসম তখন সদ্য স্বাধীন ভারতের অংশ, একদিন ‘দ্য আসাম ট্রিবিউন’-এ একটি বিজ্ঞপ্তি বেরোয়—আসাম ফ্লাইং ক্লাব থেকে।
“অঞ্চলের তরুণদের জন্য ২ বছরের মধ্যে পাইলট হওয়ার ছয়টি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ বৃত্তি”র।
বিজ্ঞাপনটি দেখে পিতা বুঝে যান মেয়ের মনোবাসনা। মায়ের আপত্তি থাকলেও ধীরা শুরু করেন প্রশিক্ষণ। দুই বছর ধরে আসাম ফ্লাইং ক্লাবে কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি কৌশল আয়ত্ত করেন ধীরা। প্রতিদিনের উড্ডয়ন, ঝাঁকুনি-ভরা অবতরণ—সবকিছু ধীরে ধীরে তাঁকে গড়ে তোলে আসামের প্রথম মহিলা পাইলট হিসেবে।
এক সকালে প্রশিক্ষক জানালেন, তিনি প্রস্তুত প্রথম একক উড়ানের জন্য। উত্তেজনা আর বিস্ময়ে তরুণী ধীরা নিজেই বসেন ককপিটে। লিভার আর বোতাম সামলিয়ে নিজেকে বেঁধে নেন, আর মুহূর্তেই আকাশে উড়ে যান। সোনালি রোদ আর মেঘের আড়ালে তিনি উপভোগ করেন আকাশের নীল আর মাটির সবুজ।
সে সময়ে প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না—রেডিও, টাওয়ার আর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল দুর্বল ছিল। তবুও গুয়াহাটি থেকে তেজপুর, জোরহাট হয়ে শিলং ঘুরে ৬০ ঘন্টার উড়ানের শেষে যখন গুয়াহাটির বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করেন ধীরা চলিহা হাজারিকা, সেদিন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে।
নিকটবর্তী আজারা গ্রামের গ্রামবাসীরা ভিড় করেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। কারণ সেই প্রথমবার যখন কোনো অহমিয়া তরুণী নিজের হাতে বিমানের স্টিয়ারিং ধরে উড়ে এসে অবতরণ করলেন—মাত্র ২১ বছর বয়সে।
ধীরা চলিহা হাজারিকা প্রমাণ করেছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতেরও একটি কন্যা আছে যাকে নিয়ে গর্ব করা যায়। তিনি চেয়েছিলেন বাণিজ্যিকভাবে পাইলট হিসেবে উড়তে। কিন্তু সমাজের টানাপড়েনে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। প্রথম উড়ানের দুই বছরের মধ্যে তার বিয়ে হয়ে যায় কমল হাজারিকার সঙ্গে।
লাইসেন্সের জন্য প্রস্তুত থাকলেও তাঁকে স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে চলে যেতে হয়। সেখানেও চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পরিবারের দায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন উড়ান পেশা থেকে সরে আসার। আজও তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আফসোস নেই।
দশকের পর দশক কেটে গেলেও ধীরা চলিহা হাজারিকার গল্প আজও প্রতিটি স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণীকে অনুপ্রাণিত করে। ছোটবেলার দুষ্টু মেয়ে থেকে বিদ্রোহী কিশোরী, আর সেখান থেকে এক অনন্য নারীতে পরিণত হওয়া—তাঁর কাহিনি আসাম ও সমগ্র দেশের কাছে গর্বের।
চৌঁষট্টিটি বছর পেরিয়ে আবার আকাশের দখল নিয়ে ধীরা প্রমাণ করলেন—স্বপ্নের কোনো মেয়াদ থাকে না, বয়স আসলে শুধু একটি সংখ্যা।


