Saturday, May 9, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

বহু সংগ্রামের শেষে পাওয়ার লিফ্টিং-এ দেশের সোনার মেয়ে ধুপগুড়ির গীতাঞ্জলি সাহা

একটা সময়, যে মেয়েটাকে পণ এর জন্য শ্বশুর বাড়ি থেকে প্রতিদিনই অ’ত্যা’চা’র সহ্য করতে হয়েছিল, এমনকি স্বামীর থেকে পেয়েছেন বডি শেমিং, সেই মেয়েই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন বিশ্বমঞ্চে ভারতের পতাকা উঁচিয়ে ধরে ।

জলপাইগুড়ির ধুপগুড়ি বাসিন্দা গীতাঞ্জলি সাহা, বাবা রুহিদাস সাহা । খুব সাধারণ পরিবারের গল্পের মতই চলছিল তাদের জীবন। গ্রাজুয়েশনের ফাইনাল পরীক্ষার সাথেসাথেই তার পরিবার তাকে বিয়ে দেয়। বাবার জমানো টাকা আর জমি বিক্রি করে অনেক ধুমধাম করে বিয়ে হয় গীতাঞ্জলির।
গীতাঞ্জলির কথায়, স্বামী এবং তার পরিবারের কাছ থেকে অপমান, মানসিক অত্যাচার, এমনকি ক্ষুধার যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয় তাকে । এমনকি তার স্বামী তাকে সরাসরি বলতেন,—“তুমি কুৎসিত, তুমি আমার যোগ্য নও।” গীতাঞ্জলির আরও জানান,স্বামী বলেছিলেন —“যদি বাবার কাছ থেকে বিশ লাখ টাকা আর বাড়ি লিখে দাও, তবেই ভালোবাসা পাবে।”

তবুও গীতাঞ্জলি মুখ বুজে সব সহ্য করেছিলেন পরিবারের সম্মানের জন্য। শেষে যখন অত্যাচার চরমে পৌঁছালো, ডিভোর্স নিতে বাধ্য হন গীতাঞ্জলি। কিন্তু বিয়েতে দেওয়া গয়না, আসবাবপত্র, কিছুই ফেরৎ পাননি তিনি । কোর্টে কেস এখনও চলছে।

একদিকে আইনের লড়াই, অন্যদিকে ভেঙে পড়া শরীর আর মন।
কিন্তু ঠিক এখানেই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ডাক্তাররা বললেন—মানসিক ও শারীরিক অবস্থা ভালো করার জন্য ব্যায়াম শুরু করতে হবে। সেই অনুযায়ী গীতাঞ্জলির মা তাকে একটি জিমে ভর্তি করে দেন।
কিন্তু ভাগ্য যেন তখনও পরীক্ষা নিচ্ছিল। ভুল প্র্যাকটিসের ফলে বাঁ হাত গুরুতরভাবে জখম হয়—দুটো হাড়ের মাঝখানে তৈরি হয় বড় গ্যাপ। এতটাই খারাপ অবস্থা হয় যে এক গ্লাস জলও তুলতে পারতেন না গীতাঞ্জলি।
ধুপগুড়ির ডাক্তাররা কিছু করতে পারলেন না। শিলিগুড়ির ডাক্তারের কাছে গিয়ে পেলেন নতুন আশা—জানা যায় ওষুধে নয়, শুধু এক্সারসাইজেই ঠিক হতে পারে এই সমস্যা, আর তখনই জীবনে আসেন তার গুরু— সোনু শর্মা।

তিনি শুধু হাতের শক্তিই ফেরাননি, বরং তাকে তৈরি করতে শুরু করেন এক পাওয়ার লিফটার হিসেবে।
হাতের ইনজুরি ভুলে গীতাঞ্জলি শুরু করলেন কঠোর অনুশীলন। একদিন ডিসট্রিক্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, তারপর বেঙ্গল চ্যাম্পিয়নশিপ—একটার পর একটা গোল্ড তার হাতে উঠতে লাগল। তখন অনেকেই কটাক্ষ করেছে, বাধা দিয়েছে, কোচকে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু কোচ শুধু বলেছিলেন—“আমার গুরুদক্ষিণা হবে যেদিন তুমি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পতাকা উড়িয়ে দেবে।”

এরপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ। ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে একের পর এক পদক—গোল্ড, সিলভার, ব্রোঞ্জ। এমনকি রেকর্ডও ভেঙে দিলেন তিনি। সিলেকশন হল আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য।

কিন্তু সমস্যার শেষ নয় সেখানেও। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যেতে প্রয়োজন ছিল প্রচুর টাকার। কোনো জায়গা থেকে সাহায্য পাওয়া না যাওয়ায়, কোন উপায় না পেয়ে, গীতাঞ্জলির মা তার নিজের সোনার বালা বিক্রি করে মেয়ের হাতে সেই অর্থ তুলে দেন। উদ্দেশ্য – “দেশের নাম উজ্জ্বল করা”।
আর সেই অর্থেই গীতাঞ্জলি রওনা দিলেন নেপালের কাঠমান্ডুর উদ্দেশে।

সেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে, শারীরিক ব্যথা, কাঁধের টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়া, চোখের জল—সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি লড়লেন। আর ফলাফল?
গীতাঞ্জলি সাহা ভারতের জন্য জিতলেন একটি গোল্ড এবং একটি সিলভার মেডেল।