Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

থেরি কাডু: তামিলনাড়ুর বুকে লুকিয়ে থাকা দক্ষিণ ভারতের লাল মরুভূমি

সব মরুভূমিই কি সোনালি? মোটেও যে তা নয়, সে বিষয়টি তামিলনাড়ুর থুতুকুড়ি ও তিরুনেলভেলি জেলায় বিস্তৃত থেরি কাডু— কে দেখলেই বোঝা যায়।

দক্ষিণ ভারতের ভূতাত্ত্বিক রহস্য ও প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ বিরল লাল বালির মরুদেশ এই থেরি কাডু, যা প্রকৃতিপ্রেমী ও অনুসন্ধিৎসু ভ্রমণকারীদের কাছে এক অজানা বিস্ময়।
প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই লাল মরুভূমি পৃথিবীর বুকে বয়ে যাওয়া সময়, বাতাস ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের অনন্য নিদর্শন বহন করে যাচ্ছে।

তামিলনাড়ু মানেই সাধারণত আমাদের মানসে সবুজ ধানক্ষেত, প্রাচীন মন্দির ও বঙ্গোপসাগরের শান্ত উপকূলরেখার ছবি ভেসে আসে। কিন্তু এই রাজ্যেই রয়েছে দেশের অন্য সব মরুভূমির থেকে একদম আলাদা এক বিস্ময়কর ভূপ্রকৃতি—থেরি কাডু।

উচ্চমাত্রার আয়রন অক্সাইডের উপস্থিতিতে বালির গাঢ় লাল রং এই এলাকাকে করে তুলেছে অনন্য।
থেরি কাডুর উৎপত্তি কোয়ার্টানারি যুগে, কয়েক হাজার বছরের প্রাকৃতিক রূপান্তরের সাক্ষী এই ভূখণ্ডের নামের অর্থই হলো “লাল বালির বন”। গবেষকদের মতে, সমুদ্রতল ও বাতাসের চলন (aeolian) প্রক্রিয়ার সম্মিলনে এই স্থানের জন্ম।

মাদুরাই কৃষি কলেজ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিভাগের প্রধান ড. ক্রিস্টি নির্মলা মেরি জানান, প্রায় ১০,০০০ বছর আগে শেষ বরফযুগে সমুদ্রপৃষ্ঠ নেমে যাওয়ায় বিশাল সি-শেল্ফ উন্মুক্ত হয়েছিল। সেসময় শক্তিশালী বাতাস ওই উন্মুক্ত শেল্ফ ও পশ্চিমঘাট থেকে আয়রনসমৃদ্ধ কণাগুলো এনে দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে জমা করে। সেই সঞ্চিত লাল বালিই আজকের থেরি কাডুর ঢেউখেলানো টিলাগুলোর রূপ দিয়েছে।
ড. ক্রিস্টির মতে, থেরি কাডু প্রচলিত ভাবে দীর্ঘ শুষ্কতার ফলে গঠিত মরুভূমি নয়; বরং বাতাসের দ্বারা পরিবাহিত লৌহসমৃদ্ধ বালির সঞ্চয়ে এই ভূমি গড়ে উঠেছে। ভূতাত্ত্বিক চিহ্নগুলো প্রমাণ করে যে একসময় এই এলাকা সমুদ্রের নিচে ছিল।

থেরি কাডু অন্যান্য মরুভূমির তুলনায় আকারে ছোট হলেও বৈচিত্র্যময় গঠনের জন্যে অত্যন্ত বিশেষ।
উপকূলের থেকে এর দূরত্ব অনুযায়ী এটি তিন ভাগে বিভক্ত:
1. ইনল্যান্ড থেরি – সমুদ্র থেকে দূরে, তুলনামূলক স্থিতিশীল টিলা
2. নিয়ার কোস্টাল থেরি – মাঝামাঝি অবস্থানে, বাতাস ও মানবগতির ফলস্বরূপ মাঝারি পরিবর্তনশীল
3. কোস্টাল থেরি – দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রবল হাওয়ায় সবচেয়ে বেশি নড়চড় হয়, ক্রমাগত পরিবর্তনশীল মরুদৃশ্য
ড. ক্রিস্টি জানান, থেরি কাডুর বালুচর অবিরাম সরে সরে যায়, যা একে সম্প্রতি গঠিত ও অপরিণত মৃত্তিকা হিসেবে চিহ্নিত করে। এই ক্রমশ পরিবর্তনশীল ভূপৃষ্ঠ গবেষকদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ।
তবুও এই অঞ্চল ভূতাত্ত্বিকদের জন্য এক প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরির মত।

থেরি কাডু মরুকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মৃত্তিকার গঠন নিয়ে গবেষণার জন্য এক অমূল্য ক্ষেত্র। বালির স্তরের বয়স ও পরিবেশগত পরিবর্তন নির্ণয়ে গবেষকেরা লুমিনেসেন্স ডেটিং-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
লৌহসমৃদ্ধ এই বালিতে হেমাটাইট, ম্যাগনেটাইট, লাইমোনাইটসহ একাধিক খনিজ রয়েছে, যা মনসেল সয়েল কালার সিস্টেম অনুযায়ী ২.৫ YR লাল বর্ণকে নির্দেশ করে। এই খনিজই মরুভূমিকে তার বিশেষ লাল আভা দেয়।
কঠিন পরিবেশেও এখানে তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্র জীববৈচিত্র্য। দেখা মেলে ভেলভেট পুচি, ফ্যান-থ্রোটেড লিজার্ড, স্পটেড আউলেট, ইউরেশিয়ান কেস্ট্রেল ইত্যাদি প্রাণীর। খেজুর, কাজু ও ক’টি ঝোপঝাড়ও টিকে আছে।
তবে ড. ক্রিস্টি জানান, থেরি মৃত্তিকার জলধারণক্ষমতা খুবই কম হওয়ায় সেচ কঠিন, ধান ইত্যাদি ফসল জন্মানো প্রায় অসম্ভব। ব্যয়বহুল ড্রিপ ফার্টিগেশন ব্যবস্থায় কিছু গাছ লাগানো গেলেও, অধিকাংশ কৃষক দেশীয় গাছপালার ওপরই নির্ভরশীল।
পৃথিবীর পরিবর্তনশীল রূপের জীবন্ত উদাহরণ থেরি কাডু কেবল লাল বালির টিলা নয়; এটি পৃথিবীর গতিশীল ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। কোয়ার্টানারি যুগ থেকে আজ পর্যন্ত প্রকৃতির অবিরত রূপান্তরের ফলে গড়ে ওঠা এই বিস্ময়কর ভূমি এখনও বহু অমীমাংসিত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা হোক বা বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—থেরি কাডুর মতো মরুদৃশ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতি আমাদের প্রচলিত ধারায় থাকা ধারার বাইরে গিয়েও সৃষ্টি করে চলেছে অচেনা, অপূর্ব বিস্ময়।
ভবিষ্যতের দিকে এগোতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা, সংরক্ষণ ও দায়িত্বশীল পর্যটন। তাহলেই এই লাল মরুর অনন্য ভূদৃশ্য রক্ষা পাবে আগামী প্রজন্মের জন্য—পৃথিবীর ইতিহাসের এক নীরব অথচ গভীর দলিল হিসেবে।