Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

পুরনো কাঁথার নতুন রূপকথা: নানুরের সুঁচ-সুতোয় বোনা হচ্ছে শত নারীর স্বনির্ভরতার স্বপ্ন

শান্তিনিকেতনের অদূরে বীরভূমের নানুর গ্রাম। একসময় যেখানে কাঁথা সেলাই ছিল নিতান্তই অভাবের সংসারে পুরনো কাপড় জোড়া দেওয়ার উপায়, আজ তা-ই হয়ে উঠেছে স্বনির্ভরতার হাতিয়ার। তাজকিরা বেগমের হাত ধরে এই ঘরোয়া শিল্প আজ শত শত মহিলার মুখে হাসি ফুটিয়েছে, দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি।
নানুরের অধিবাসীদের কাছে কাঁথা সেলাই বংশপরম্পরায় শেখার শিল্প। সেই পরম্পরা মতেই মাত্র সাত বছর বয়সে মা ও দিদিমার পাশে বসে কাঁথা সেলাই শুরু করেছিলেন তাজকিরা বেগম।

তখন কোনো প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছিল না, ছিল কেবল দেখে শেখার আগ্রহ। পুরনো শাড়ি বা ধুতির একাধিক স্তর জুড়ে তৈরি হতো এই কাঁথা, যা শীতের ওম দিত। বিয়ের সময় পাত্রীর গুনাবলীর পরিচায়ক রূপে সংরক্ষিত হত বাড়িতে বোনা সবথেকে ভাল কাঁথাগুলো, যা পরে মেয়েদের বিয়ের উপহার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তখন এই শিল্পের কোনো বাণিজ্যিক মূল্য ছিল না, ছিল কেবল ভালোবাসা আর পরিবারের প্রয়োজন।
কিন্তু দিনবদলের পালা শুরু হয় ২০০২ সাল থেকে।

২০০২ সাল ছিল এই গ্রামের নারীদের জন্য এক সন্ধিক্ষণ। ‘বাংলা নাটক ডট কম’-এর সহায়তায় গ্রামে তৈরি হলো স্বনির্ভর গোষ্ঠী। যে সেলাই এতদিন পুরনো কাপড়ে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এবার ফুটে উঠল নতুন কাপড়ে। ৫-১০ হাজার টাকার ছোট ঋণ নিয়ে মহিলারা শুরু করলেন নতুন পথচলা। কাঁথার চিরাচরিত নকশাই নতুন রূপে জায়গা করে নিল ওড়না, স্টোল আর গৃহসজ্জার সামগ্রীতে।

গ্রাম থেকে গ্লোবাল
তাজকিরা বেগমের নেতৃত্বে এই শিল্প নানুরের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাড়ি দিল দেশ-বিদেশে। একসময় যে নারী গ্রামের বাইরে পা রাখেননি, কাঁথা শিল্পের সুবাদেই তিনি পৌঁছে গেলেন প্যারিস ও জাপানের প্রদর্শনীতে। মহিলারা বুঝতে শিখলেন তাঁদের শ্রমের সঠিক মূল্য। যে স্টোল গ্রামে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতো, শহরের বাজারে তার কদর যে অনেক বেশি, সেই আত্মবিশ্বাসই তাঁদের বাণিজ্যের ভীত শক্ত করল।
উপার্জন এর সাথে এল আত্মসম্মান।
এই উপার্জন কেবল অর্থের জোগান দেয়নি, দিয়েছে সামাজিক মর্যাদা। তাজকিরা বেগম বলেন, “একসময় ভাবা হতো নারীরা উপার্জন করতে পারে না। আজ সেই ধারণা বদলেছে।” এই আয়েই মিটছে সংসারের খরচ, সন্তানেরা পাচ্ছে উচ্চশিক্ষা। যে গ্রামে একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরোত, আজ সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে ডাক্তার ও শিক্ষক।
দিচ্ছে আগামীর পথচলার দিশা।
নানুরের কাঁথা শিল্প আজ আর স্থবির নয়। অভাবের দিনের সেই সেলাই এখন স্বচ্ছলতার প্রতীক। তাজকিরা বেগমের কথায়, “সেরা কাঁথাটি এখন আর শুধু বিয়ের জন্য তুলে রাখা হয় না। এটি দেশ-বিদেশ ঘুরে আমাদের জীবনের গল্প বলে এবং আমাদের শ্রমের মর্যাদা ফিরিয়ে আনে।”