এশিয়ার প্রথম এইচআইভি+ মানুষের দ্বারা পরিচালিত ক্যাফে ‘ক্যাফে পজিটিভ’-এ কফি পরিবেশন হয় গরম গরম, আর তা উপভোগ করা হয় বিনা দ্বিধায়। সমাজকর্মী কল্লোল ঘোষের ভাবনাপ্রসূত এই ক্রাউডফান্ডেড ক্যাফেটি দেশপ্রিয় পার্কের কাছে, লেক ভিউ রোডের ৬৪এ নম্বরে অবস্থিত।
শুধু কলকাতাতেই নয়, প্রতিষ্ঠাতা কল্লোল ঘোষের পরিকল্পনা, দিল্লি, মুম্বই, পুনে, লখনউ ও গুয়াহাটির মতো দেশের বিভিন্ন শহরে ‘ক্যাফে পজিটিভ’ এর শাখা বিস্তারের।
“ছোট কিয়স্ক খোলার জন্য আমরা একাধিক মল ও বিমানবন্দরের সঙ্গে কথা বলছি। দিল্লি, মুম্বই, পুনে, লখনউ ও গুয়াহাটির মতো শহরে এবং দেশ জুড়ে প্রায় ৩০টি ক্যাফেটেরিয়া চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য ওই শহরগুলির এইচআইভি+ কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাদেরকে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে,” বললেন ঘোষ।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও এই উদ্যোগ নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে তাঁর। “এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ‘ক্যাফে পজিটিভ’-এর শাখা খোলার জন্য ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তার আগে আমি চাই, ভারতের মাটিতেই এই আইডিয়াটিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে,” যোগ করেন তিনি।
যেভাবে শুরু….
সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি ক্যাফে তৈরির ভাবনা কল্লোল ঘোষের মাথায় আসে জার্মানি সফরের সময়। মিউনিখে তিনি দেখেছিলেন, এইচআইভি+ মানুষের দ্বারা পরিচালিত একটি রেস্তোরাঁ। কিন্তু দেশে ফিরে ক্যাফে শুরু করতে গিয়ে বড় বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁকে।
“আমাদের ভাবনার কথা শুনে বেশিরভাগ মানুষই জায়গা ভাড়া দিতে চাইতেন না,” জানান ঘোষ।
শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে যোধপুর পার্কের একটি ছোট গ্যারাজ থেকে ‘ক্যাফে পজিটিভ’-এর যাত্রা শুরু করেন তিনি। এই ক্যাফের শিকড় জড়িয়ে রয়েছে এইচআইভি+ কমিউনিটির জন্য কিছু করার তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্নে।
২০০০ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোবিন্দপুর এলাকায় এইচআইভি+ অনাথ শিশুদের জন্য তিনি ‘আনন্দঘর’ নামে একটি আশ্রয়স্থল গড়ে তোলেন। আজও সেই প্রতিষ্ঠান সক্রিয়, যেখানে প্রায় ৭০ জন শিশু ও তরুণ-তরুণী উপকৃত হচ্ছেন। বর্তমানে ‘ক্যাফে পজিটিভ’-এ কাজ করছেন সেই আনন্দঘরেরই অনাথরা।
‘ওরা যদি পারে, তুমি কেন পারবে না?’ এই সংকল্পই এদের মূল ভিত্তি
৬৪০ বর্গফুটের ক্যাফেটি ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে বর্তমান লেক ভিউ রোডের ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়। তিনতলা বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে অবস্থিত এই ক্যাফে।
৩ এপ্রিল,২০২১এ অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার সংস্কারের পর ফের কফিপ্রেমীদের জন্য দরজা খুলেছে ক্যাফে পজিটিভ। সাদা রঙে ধোয়া বাইরের দেওয়াল, কাচ ও কাঠের আসবাব, ভেতরের বসার জায়গায় স্পটলাইট এবং ক্যাফের সামনেই আউটডোর সিটিং—সব মিলিয়ে নতুন এক চেহারা পেয়েছে ক্যাফেটি।

ভেতরের দেওয়ালজুড়ে রয়েছে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মনীষীদের অনুপ্রেরণামূলক উক্তি। আটজন কর্মীর জন্য আরও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ গড়ে তুলতে চ্যাক পানোজ্জো, জেরি হারম্যান ও ভিক্টর লুনার মতো খ্যাতনামা এইচআইভি+ ব্যক্তিত্বদের জীবনের অংশবিশেষ ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—মনের মধ্যে এই ভাবনাটি গেঁথে দেওয়া: “ওরা যদি পারে, তুমি কেন পারবে না?”
ক্যাফের খাবারের সম্ভার আর সব ক্যাফের থেকে একটু আলাদা।
এক কাপ গরম লাতে কিংবা দার্জিলিং ফ্লাশ চায়ে চুমুক দিতে দিতে ক্যাফের বুকশেলফ থেকে সলিল চৌধুরীর প্রবন্ধসংকলন থেকে শুরু করে অমর্ত্য সেনের দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান—পাতা উল্টে নেওয়া যায় অনায়াসেই। অর্থাৎ পেটের সাথে মগজের খাবার ও পাওয়া যায়।
খাবারের তালিকায় জনপ্রিয় কিছু পদ হল গ্রিলড চিকেন স্টেক, বারবিকিউ পর্ক বার্গার, পনির র্যাপ, মিট প্ল্যাটার, কটেজ চিজ রাইস বোল ও স্প্যাগেটি বোলোনিজ। শেষে মিষ্টিমুখের জন্য রয়েছে মাফিন, চিজকেক ও কাস্টার্ড—দাম ৯০ টাকা থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে।
ক্যাফের অন্দরমহলের সূত্র অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পদ হল ফিশ অ্যান্ড চিপস।
উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করে কর্মসংস্থানের একটি পরিবেশ তৈরি করতে গিয়ে খাবারের মানের সঙ্গে কোনও আপস করতে চান না ঘোষ।
“আমি বা আমার সন্তানরা কেউই চাই না, শুধুমাত্র আবেগের দায়ে কেউ এখানে এসে খাবার নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যাক,” বলেন তিনি।
কলকাতাতেই কেন এই উদ্যোগ?
এসপ্রেসোতে চুমুক দিতে দিতে কল্লোল ঘোষ বললেন, “এটা এমন এক আন্দোলন, যার পথ দেখাতে পারে শুধু এই কলকাতাই।
এমন নয় যে দেশের অন্য জায়গায় এইচআইভি+ মানুষ থাকেন না। তাহলে সেখানে কেন এটা হয়নি?
এই শহর রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন, আর এখানকার মানুষ অংশগ্রহণে সক্রিয়। সমস্যা থাকবেই, কিন্তু কলকাতার একটা আলাদা স্পিরিট আছে।”
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও লক্ষ্য কী
আর্থিক ও কাঠামোগত নানা সমস্যার মুখে পড়লেও কল্লোল ঘোষের ঝুলিতে রয়েছে একাধিক উদ্যোগী ভাবনা। অতিমারির সময় তিনি এইচআইভি+ কমিউনিটিকে নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করে একটি অনলাইন ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্মে আপলোড করেন।
“ন’দিনে ২০ লক্ষ টাকা উঠেছিল! আজ বহু প্রতিষ্ঠিত পেশাদার মানুষ আমাদের উদ্যোগে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছেন। এই অন্তর্ভুক্তিটাই আমি চাই,” বলেন তিনি।
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার উৎসব মুখোপাধ্যায় নিয়মিত এই ক্যাফেতে আসেন এবং এখানকার “চমৎকার কফি”র ভক্ত। তাঁর কথায়, “আমি যদি প্রতিদিনের জীবনে এই জায়গার অংশ হতে পারি, তবে আমার বন্ধু ও সহকর্মীরাও এখানে আসতে পারেন এবং সমাজে এখনও যে কলঙ্কটা রয়ে গেছে, তা দূর করার জন্য আমরা সবাই মিলে কিছু করতে পারি। এটাকে স্বাভাবিক করে তোলাই সবচেয়ে জরুরী।” বললেন উৎসব।


