Monday, June 29, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

‘নিষিদ্ধ পানীয়’-এর খোঁজ থেকেই কান চলচ্চিত্র বাজারে পৌঁছনো! শেফ-চলচ্চিত্র নির্মাতা শ্রীময়ী চক্রবর্তীর তথ্যচিত্রের অনন্য যাত্রা

‘স্পিরিট অফ দ্য ওয়াইল্ডফ্লাওয়ার’- কলকাতার মেয়ের তথ্যচিত্র-এ উঠে এসেছে মধ্যপ্রদেশের বস্তার অঞ্চলে ভারতের প্রথম বৈধ মহুয়া ডিস্টিলারি পরিচালনাকারী দুই আদিবাসী ভাইবোনের জীবনসংগ্রাম।

অধুনা লন্ডন-প্রবাসী, দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা, একাধারে শেফ, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং টেলিভিশন সঞ্চালক শ্রীময়ী চক্রবর্তী, যিনি অ্যাপল টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইন্ডিয়া বাইটস্ -এর সঞ্চালক হিসেবে পরিচিত, এবার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন। তাঁর প্রথম তথ্যচিত্র স্পিরিট অফ দ্য ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার-এ তুলে ধরা হয়েছে মধ্যপ্রদেশের বস্তার অঞ্চলে ভারতের প্রথম বৈধ মহুয়া ডিস্টিলারি পরিচালনাকারী দুই আদিবাসী ভাইবোনের জীবন ও সংগ্রামের কাহিনি।

এই তথ্যচিত্রটি ২০২৬ সালের মার্শে দ্যু ফিল্ম-এ প্রদর্শিত হয়েছে। কান চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালীন ১২ থেকে ২০ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই চলচ্চিত্র বাজার।

‘কান’-এ যাওয়ার আগে কলকাতার মিডিয়া-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শ্রীময়ী জানান, ভারতের তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ পানীয়’ এবং সমাজের প্রান্তিক ও কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েই এই প্রকল্পের সূচনা। সেই অনুসন্ধানই তাঁকে পৌঁছে দেয় বস্তারের গভীর অরণ্যে, যেখানে অঙ্কিতা ও ভিনু নামে দুই ভাইবোন পরিচালনা করছেন মহুয়া ডিস্টিলারি।

“আমি তখনই বুঝেছিলাম, এটাই আমার গল্প,” বলেন শ্রীময়ী। “চার বছর আগে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আর আজ আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য পরিচালিত তথ্যচিত্র নিয়ে আমি মার্শে দ্যু ফিল্ম-এ যাচ্ছি।”

তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে কুড়ির কোঠায় থাকা অঙ্কিতাকে, যিনি ডিস্টিলারিটিকে সফল করে তোলার লক্ষ্যে প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। পাশাপাশি রয়েছেন তাঁর ছোট বোন ভিনু, যার স্বপ্ন পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জন করে নিজেকে একজন পুরুষের পরিচয়ে রূপান্তরিত করা।

“এটি শুধুমাত্র ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে নারীদের তৈরি একটি পানীয়ের গল্প নয়,” ব্যাখ্যা করেন শ্রীময়ী। “এই তথ্যচিত্র লিঙ্গ, পরিচয়, সামাজিক অনুশাসনের বাইরে থাকা মানুষদের জীবন এবং বিদ্রোহের মতো বিষয়গুলি অনুসন্ধান করে। এই সিনেমা একদিকে যেমন সমাজের আয়না, তেমনই অন্যদিকে প্রতিবাদেরও এক শক্তিশালী ভাষা।”

টানা তিন বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে তথ্যচিত্রটির শুটিং হয়েছে। সেই সময়ে নির্মাতা দলকে পৌঁছতে হয়েছে দুর্গম অরণ্যাঞ্চলে। সেখানে পরিবহণ, থাকার জায়গার অভাব এবং মাঝেমধ্যেই নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের।

শ্রীময়ীর কথায়, “আমাদের ইউনিটে বেশিরভাগই নারী সদস্য ছিলেন। তাই অনেক সময় পুলিশের নিরাপত্তা নিতে হয়েছে। একবার কাঠিওয়াড়া গ্রামে শুটিং চলাকালীন একটি বাসে আগুনও লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এলাকাগুলি ছিল নকশাল-প্রভাবিত।”

তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও এই অভিজ্ঞতাকে জীবনের অন্যতম রূপান্তরমূলক অধ্যায় বলেই মনে করেন তিনি।

“আমি সেখানে গিয়েছিলাম স্থানীয় সহযোগী খুঁজতে। কিন্তু বদলে এমন দু’জন অসাধারণ মানুষের সন্ধান পেয়েছি, যাঁদের মতো মানুষ জীবনে খুব কমই দেখা যায়। তথ্যচিত্র নির্মাণের এটাই সৌন্দর্য—এটি আপনাকে এমন সব মানুষের জীবনের কাছে নিয়ে যায়, যাদের অন্যথায় কখনও চিনতেই পারতেন না। অভিজ্ঞতাটা সত্যিই অসাধারণ।”

তথ্যচিত্রটির শুটিং চলাকালীন নিরলস সহযোগিতার জন্য আই এ এস অফিসার দীপালি রাস্তোগি-কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন শ্রীময়ী।

তাবেরনাকল স্ট্রিট ফিল্মস্ এবং আদ্যাহ্ ফিল্মস্, সহ-প্রযোজক ফিচারিস্টিক ফিল্মস্-এর সহযোগিতায় এই প্রকল্পটি উপস্থাপন করছে।

তথ্যচিত্রটির প্রযোজক শ্রীময়ী চক্রবর্তী এবং ওম সিং। কার্যনির্বাহী প্রযোজক হিসেবে রয়েছেন কেশব সুরি, পার্নো মিত্র, রাধিকা পিরামল এবং নীরজ চুরি।

চিত্রগ্রহণ করেছেন রুশা বসু। সম্পাদনার দায়িত্ব সামলেছেন জয়দীপ দাস, অনাদি আঠালে এবং বেদান্ত যোশী। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন অঙ্গদ উদয় এবং শব্দ পরিকল্পনা করেছেন সুকৃত সেন।

পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজ সম্পন্ন করেছে স্টুডিও মিমেসেস, সহযোগিতায় ছিল ব্রিজ পোস্টওয়ার্কস্—যারা অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র দ্য এলিফ্যান্ট হুইসপারারস্-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিল—এবং অবশ্যই মধ্যপ্রদেশ সরকার।

শ্রীময়ী জানান, বর্তমানে স্পিরিট অফ দ্য ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার-এর আন্তর্জাতিক মুক্তির পরিকল্পনা চলছে।

“মুম্বইয়ের সোহো হাউস-এ নির্বাচিত দর্শকদের জন্য আমরা একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম। আন্তর্জাতিক মুক্তির পর ছবিটি ভারতের প্রেক্ষাগৃহেও মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে,” বলেন তিনি।

পাশাপাশি তিনি জানান, এই তথ্যচিত্র তাঁর মেয়ের উদ্দেশেও এক ‘ভালোবাসার চিঠি’।

পরিচালকের কথায়, “আমি চাই, আমার মেয়ে এমন এক পৃথিবীতে বড় হয়ে উঠুক, যেখানে ভিন্নতাকে, বিবিধতাকে অসম্মান নয়, সম্মান জানানো হয়।”