Friday, August 14, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

ভাস্কর্যের ভাষায় কলকাতাকে ভালবাসার চিঠি মিনিয়েচার শিল্পী মূর্ছনার

একদিকে সরকারি স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দায়িত্ব অন্যদিকে এক টডলারের মা, মূর্ছনা বন্দ্যোপাধ্যায়— পলিমার ক্লে দিয়ে তৈরি মিনিয়েচারের মাধ্যমে উদ্যাপন করছেন এই শহরের অলি-গলি, খাবার, বই আর স্মৃতির নস্টালজিয়া।
বেশিরভাগ রাতেই, যখন তাঁর ১৯ মাসের সন্তানটি অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ে, হাওড়ার বাসিন্দা মুর্ছনা পা টিপে টিপে ঢুকে পড়েন নিজের জগতে, সন্তানের শোবার ঘরের মেঝেতে। সেটাই তাঁর স্টুডিও।
শহর যখন গভীর নিদ্রায়, তখনই তিনি পলি-ক্লে এর ভাস্কর্যে গড়ে তোলেন কলেজ স্ট্রিট, চায়ের দোকান আর কলকাতার অলস রবিবার বিকেলের ক্ষুদ্র সংস্করণ—সত্যিকারের ‘সিটি অফ জয়’-এর নিবিড় অনুরণন।
‘দ্য মিনিয়েচার ল্যাব’ পরিচালনার পাশাপাশি ৩৬ বছর বয়সি মূর্ছনা সামলান স্বাস্থ্য মন্ত্রকে তাঁর নিয়মিত ১০টা–৫টার চাকরিও।

“দিনের সব দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর, মাঝরাতে একটুখানি নির্জন সময়ই আমার একমাত্র খোলা জানালা—এই ছোট ছোট আনন্দের টুকরো বানানোর,” বললেন তিনি।
গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুলের প্রাক্তনী মূর্ছনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। হাসতে হাসতেই বললেন, “আমি খুবই মাঝারি মানের ছাত্রী ছিলাম। কিন্তু শিল্পকে কোনোদিন ছেড়ে যাইনি।”

সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে কিছুদিন গয়না ডিজাইনিং করেছিলেন তিনি। তবে ২০২৩ সালে একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওর মাধ্যমে হঠাৎ করেই মিনিয়েচার শিল্প যেন তাঁকে খুঁজে নেয়। “ইনস্টাগ্রামে আমি একেবারেই নতুন ছিলাম। হঠাৎ দেখি কেউ একটি মিনিয়েচার বানানোর নেপথ্য ভিডিও শেয়ার করেছে। আর আমি তাতে সম্পূর্ণ মুগ্ধ হয়ে যাই।”
প্রায় কোনো টিউটোরিয়াল না থাকায়, আন্তর্জাতিক শিল্পীদের কাজ মন দিয়ে দেখে নিজেই নিজেকে শিখিয়েছেন তিনি। “আমি মনে হয় সারা বিশ্বের ৫০০ থেকে ৬০০ জন মিনিয়েচার শিল্পীকে অনুসরণ করেছি। মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়—কোন কৌশল ব্যবহার করছেন, কোন রঙ, কোন তুলি।”

কলকাতায় মিনিয়েচারকে অনেক সময় খেলনা বা সাজসজ্জার সামগ্রী হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মূর্ছনার ভাবনা ছিল অন্যরকম। “মিনিয়েচারের আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে। এর মাধ্যমে গল্প বলা যায়।”
প্রথমে খাবারের প্লেট-আকৃতির ম্যাগনেট বানানো দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি। তবে খুব দ্রুতই তাঁর নিজস্ব পরিসর খুঁজে পান বাঙালি সংস্কৃতি আর সিটি অফ জয়কে কেন্দ্র করে। ফেলুদার পেপারব্যাকের পাশে কমলা লেবু আর কুলের আচার রাখা, ট্রামের টিকিট গুঁজে দেওয়া শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বই, কিংবা পাড়ার এক জীর্ণ চায়ের দোকান—যার সূক্ষ্ম খুঁটিনাটিতেই লুকিয়ে থাকে কলকাতার স্মৃতি, আর অলি গলির গল্প।

“পিৎজা, পাস্তা, ম্যাগির ধারায় না গিয়ে আমি শুধু আমার গল্পগুলোর ওপরেই মন দিলাম। আমি এমন জিনিস বানাতে চাই, যেগুলো আমি নিজে ভালোবাসব,” ব্যাখ্যা করেন তিনি।

তিনি কাস্টমাইজড অর্ডার নেন না। তাঁর মতে, “একই রকম ৪০টি জিনিস বানালে, আমি ৪০টি আলাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ হারাই—যেগুলো আমি বানাতে চাই।” তাঁর কাছে এই কাজ নিছক উৎপাদন নয়, ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি।
২০২৩ সালের শেষের দিকে গর্ভধারণের পর ক্লে-তে থাকা রাসায়নিক উপাদানের কারণে তিনি পলি-ক্লে নিয়ে কাজ বন্ধ রাখেন। প্রায় দেড় বছর তিনি শুধু দেখেছেন আর শিখেছেন। “ভেতরে ভেতরে এক তীব্র ক্ষুধা জমতে শুরু করেছিল। আমাকে কিছু না কিছু বানাতেই হবে।” বাচ্চার জন্ম হওয়ার অনতিপরেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে তিনি কাজে ফিরছিলেন।

দুধের শিশুকে দেখাশোনা করার মাঝে নির্ঘুম রাতের মধ্যেই একটি প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
“রাত ১১টার পর থেকে প্রায় ২-৩টা পর্যন্ত কাজ করতাম। মাঝেমধ্যে শিশুকে খাওয়াতাম, আবার মেঝেতে নেমে কাজ শুরু করতাম।”
চিকিৎসক স্বামীই তাঁর সবচেয়ে বড় সহযোদ্ধা। এক প্রদর্শনীর সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে, স্বামীই স্টল সামলান। “তিনি বলেছিলেন, ‘এটা যদি তোমার কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে আমি গিয়ে তোমার স্টলে বসে থাকব।’”

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম প্রদর্শনী থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের জুনে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে প্রদর্শনী—এই পথচলায় দর্শকদের মনোভাবের বদল তিনি স্পষ্ট দেখেছেন। “মানুষ এখন আর এটাকে শুধু ফ্রিজ ম্যাগনেট হিসেবে দেখছে না; বরং সংগ্রহযোগ্য, প্রিমিয়াম, এক্সক্লুসিভ শিল্পকর্ম হিসেবে দেখছিল।”
সম্প্রতি তিনি তৈরি করেছেন কলেজ স্ট্রিট মিনিয়েচার, যা বানাতে টানা ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে।

নাক থেকে রক্তক্ষরণের ঘটনার পর চিকিৎসক যখন বিশ্রামের পরামর্শ দেন, সেই বিরল বিশ্রামের সময়েই কাজটি সম্পন্ন করেন তিনি।
“১৯ মাসে প্রথমবারের মতো কিছুটা ‘বেবি-ফ্রি’ সময় পেয়েছিলাম। ভাবলাম শুধু বিশ্রাম নিলে একঘেয়ে লাগবে। তাই মিনিয়েচার বানালাম।”- বলেন তিনি।

ভবিষ্যতে একটি একক প্রদর্শনীর স্বপ্ন দেখেন তিনি। আর একদিন নিজের কাজ নিয়ে যেতে চান শিকাগোর টম বিশপ মিনিয়েচার শো-তে। “আমি চাই মানুষ এটিকে এমন এক শিল্পরূপ হিসেবে দেখুক, যা স্বতন্ত্রভাবে বেঁচে থাকতে পারে।”

ততদিন পর্যন্ত, মধ্যরাত পেরিয়ে, তাঁর আঙুলের ডগায় কলকাতার স্মৃতিরা নীরবে ক্ষুদ্র রূপে আসতেই থাকবে—মমতায়, স্মৃতিতে, আর শিল্পের সূক্ষ্ম স্পর্শে।