Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

মোধেরার সূর্য মন্দির : সূর্যদেবকে নিবেদিত এক স্থাপত্যের মহাকাব্য

আচ্ছা সূর্য মন্দির বললেই প্রথমে কি মনে আসে বলুন তো? অবশ্যই ইউনেস্কো হেরিটেজ ঘোষিত হওয়া উড়িষ্যার কোনার্ক মন্দির।

কিন্তু জানেন কি, আসমুদ্র হিমাচলের এই ভারতে কোনারক ছাড়াও আছে আরও পাঁচ পাঁচটি সূর্য মন্দির। যাদের মধ্যে একটি হল গুজরাটের পাটন জেলার কাছে, শান্ত পুষ্পাবতী নদীর বাম তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের অন্যতম গৌরব—মোধেরার সূর্য মন্দির।

শোনা যায় রাবনকে বধ করে ফেরার পথে, শ্রীরামচন্দ্র এই স্হানে একটি মহাযজ্ঞ করেছিলেন পাপস্খালনের উদ্দেশ্যে। সেই ঘটনার স্মরণেই সূর্য বংশীয় রাজার উদ্দেশ্যে গড়া হয় সূর্য মন্দির। তবে প্রাচীন স্থাপত্যকলার এই অনন্য নিদর্শন কেবল ধর্মীয় গুরুত্বেই নয়, শিল্প ও বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম সমন্বয়ে বিশ্ববাসীর চোখে বিস্ময় জাগায়।

১১শ শতকে সোলঙ্কি রাজবংশের রাজা ভীমদেব প্রথম নির্মাণ করেছিলেন এই মন্দিরটি। খ্রিষ্টাব্দ ১০২৬-২৭ সালের দিকে গড়ে ওঠা এই স্থাপত্যটি উৎসর্গিত সূর্য-এর উদ্দেশ্যে। রাজসিক মহিমায় ভরপুর এই মন্দির একসময় ছিল সূর্য উপাসনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

মোধেরার সূর্য মন্দিরের ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনই বেদনাবিধুর। গজনির মহম্মদ মন্দিরটি লুণ্ঠন করেন, পরে আলাউদ্দিন খিলজিও এর কিছু অংশ ধ্বংস করেন। তবু আজও যা অবশিষ্ট আছে, তা ভারতীয় স্থাপত্যের স্বর্ণযুগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মন্দির প্রাঙ্গণটি তিনটি অংশে বিভক্ত—গুঢ়মণ্ডপ (মূল গর্ভগৃহ), সভামণ্ডপ (সমাবেশ হল), এবং সুবিশাল ধাপাকৃতি জলাধার সূর্যকুণ্ড। প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের চোখ আটকে যায় সূর্যকুণ্ডে—চতুর্ভুজাকার বহু ধাপযুক্ত জলাধার, যার চারপাশে রয়েছে ১০৮টি ক্ষুদ্র দেবালয়। এই ধাপযুক্ত জলাধার উত্তর পশ্চিম ভারতের “বাওড়ি” বা “ভাও” স্থাপত্যের পরিচিত নিদর্শন।
সভামণ্ডপের ৫২টি স্তম্ভ প্রতীকীভাবে বছরের ৫২ সপ্তাহকে উপস্থাপন করে, আর সূক্ষ্ম খোদাইয়ে ফুটে উঠেছে বছরের ১২ মাসের শিল্পিত রূপ। প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি পাথর সূর্যের আলো ও গতিপথের সঙ্গে এমনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা সেই যুগের স্থাপত্যবিদ্যার অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে। মোধেরার সূর্য মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপত্য নয়, এটি এক মহাজাগতিক স্থাপত্যের বিস্ময়। প্রতিটি পাথর সূর্যের দিকনির্দেশ অনুসারে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে ভোরের প্রথম রশ্মি সরাসরি প্রবেশ করে মূল গর্ভগৃহে। এ যেন সূর্য ও স্থাপত্যের এক নীরব সংলাপ।

আজ মোধেরার সূর্য মন্দির গুজরাটের গর্ব, ভারতের ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। রাজা ভীমদেবের স্বপ্নের এই স্থাপত্য আজও সোনালি আলোয় দীপ্ত হয়ে জানায় প্রাচীন ভারতের স্থাপত্য, বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের অদ্বিতীয় কাহিনি।

রাবণবধ করে চোদ্দ বছরের বনবাস শেষে রামচন্দ্র যেদিন অযোধ্যায় ফিরেছিলেন সেই দিনটিতেই গোটা উত্তর ভারত দীপাবলি উৎসব পালন করে। আর লোককথা মতে দেশে ফেরার আগেই যেহেতু এইস্হানে তাঁরা এসেছিলেন তাই মোধেরায় দীপাবলি এক অনন্য রূপ নেয়। আলোকমালায় সেজে ওঠে গোটা মন্দির চত্বর। আয়োজিত হয় লাইট এন্ড সাউন্ড শো। দীপাবলিতে তাই মোধেরার সূর্য মন্দির দর্শন এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
একদা সূর্য উপাসনার মন্দির, আজ তা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তীর্থভূমি—যেখানে প্রতিটি পাথর এখনো বলে যায় হাজার বছরের সূর্যালোকিত গল্প।