Friday, May 8, 2026

সপ্তাহের সেরা

আরও দেখুন

আল্পনা’র জাদু: সত্তরোর্ধ শিল্পীর তুলিতে কলকাতার ঘরবাড়ির নান্দনিক রূপান্তর

রত্নাবলী ঘোষের হাতে আঁকা আলপনা ছুঁয়ে দিয়েছে লেক মার্কেটের রাস্তাঘাট, কালীপূজা ও দীপাবলির আগে শহরে ছড়িয়ে দিয়েছে রঙিন আনন্দের ছোঁয়া।

—নন্দলাল বসুর এক ছাত্রীর কন্যা রত্নাবলী ঘোষ, বয়স এখন সত্তরের কোঠায়। কিন্তু বয়স তাঁর তুলি থামাতে পারেনি। কালীপূজা ও দীপাবলির আগে তিনি প্রতিদিন সকালে লেক মার্কেট এলাকার রাস্তায়, ঘরে ঘরে, দোরগোড়ায় এঁকেছেন সাদা রঙের আল্পনা।

লাল সিমেন্টের বারান্দা, পুরনো দালানের দোরগোড়া—সব জায়গাতেই তাঁর আঁকা আল্পনা যেন এনে দিয়েছে এক নতুন প্রাণ, নতুন আলো।

— গত চার বছর ধরে কখনও একা, কখনও সহকারিণীকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রবীণা শিল্পী ঘুরে বেড়াচ্ছেন কলকাতার পথে। অচেনা মানুষদের বাড়ির সামনে নিজের হাতে তৈরি করছেন ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ছাপ—‘আল্পনা’।

অনেকে জানেন না তাঁর নামও। কিন্তু তাঁর শিল্পে তাঁদের বাড়ি, তাঁদের গলি, তাঁদের শহর নতুন করে সাজে উঠছে।

“আমি চাই মানুষ আনন্দ পাক, আর শহরটা সুন্দর হয়ে উঠুক,”—বললেন ৭২ বছর বয়সি রত্নাবলী ঘোষ। “ছোটবেলায় মা-কে আল্পনা দিতে দেখতাম। উৎসবে, বাড়িতে, আমিই আল্পনা দিতাম।”
—- মুসৌরিতে জন্ম হলেও রত্নাবলীর বেড়ে ওঠা কলকাতায়। তাঁর মা প্রীতিভা সেনগুপ্ত শান্তিনিকেতনের কলাভবনে নন্দলাল বসুর ছাত্রী ছিলেন। মা-ই অনুপ্রেরণা দেন এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতিতে।
৪০ বছরেরও বেশি শিক্ষকতা জীবনের পাশাপাশি রত্নাবলী এখন কলকাতার রাস্তায় ফিরিয়ে এনেছেন বাংলার প্রাচীন শিল্প—‘আল্পনা’।

বাংলা ও সাঁওতাল পরিবারের নারীদের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল একসময় এই শিল্প। কিন্তু আজ তা হারিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রঙিন ‘রঙোলি’।
এ বছর লেক মার্কেট, রাজা বসন্ত রায় রোড ও প্রতাপাদিত্য রোডের প্রায় দশটি বাড়ি সেজে উঠেছে তাঁর আঁকা আল্পনায়।

“আমরা চাই আল্পনাকে আবার জীবিত করে তুলতে,”—বললেন সমাজকর্মী মুদার পাতেরিয়া। “এটা এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক শিল্প। তাই আমরা প্রতি বছর কালীপুজো, দীপাবলি ও ক্রিসমাসের আগে শহরের রাস্তায় আল্পনা সাজাতে চাই।”

রত্নাবলীর প্রকাশ্য আল্পনা আঁকার যাত্রা শুরু হয় কয়েক বছর আগে এক দীপাবলির সকালে, একটি অ্যাপার্টমেন্টে ছোট্ট নকশা দিয়ে। ২০২২ সাল থেকে তাঁর ক্যানভাস হয়ে উঠেছে কলকাতার রাস্তাঘাট—উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে প্রায় ৪০টি বাড়ির সামনে সেজে উঠেছে তাঁর হাতে আঁকা শিল্পকর্ম।
বাধা এসেছে অনেক, পারিপার্শ্বিক, আবহাওয়া জনিত যেমন ২০২৪ এর ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’- কিন্তু এর প্রভাবেও থেমে থাকেননি রত্নাবলী। এ বছরও লেক মার্কেট ও আশেপাশের দশটি বাড়ি তাঁর আঁকা আল্পনায় নব সাজে সেজে উঠেছে।

একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রত্নাবলী জানান, “একবার এক বৃদ্ধ আমাকে রাস্তায় আল্পনা দিতে দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন। কাজ শেষে বিনয়ের সঙ্গে তাঁকে একটু সরে দাঁড়াতে বললে, তিনিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। পরে বললেন, অনেক ছবি তুলেছেন, ওগুলো ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে পাঠাবেন। বললেন, ‘অন্য পাড়ার একটা মেয়ে এসে আমাদের পাড়া সুন্দর করে দিয়ে গেল।’ সেই বৃদ্ধের মানসিক পরিবর্তনটাই ছিল অসাধারণ।”
আরেকদিন ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় পরাশর রোডের এক পুরনো বাড়ির সামনে আল্পনা আঁকছিলেন তিনি। দুধওয়ালা, কাজের মেয়ে—সবাই থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। কাজ শেষে তারা বলল, “বাড়িটা কত সুন্দর লাগছে!”
“আমার কাজ বা আল্পনা নয় তারা বাড়িটার পরিবর্তন লক্ষ্য করল। প্রশংসা করল। এটাই আমার উদ্দেশ্য,”—বললেন রত্নাবলী। “মানুষের রুচিবোধ যেন জেগে ওঠে, শুধু আল্পনা নয়, গোটা বাড়ি সুন্দর লাগুক।”
তাঁর আক্ষেপও আছে—“এখন অনেকে স্টিকার লাগিয়ে দেয়। সেটা আমাদের ঐতিহ্য নয়।”
গত বছর ক্রিসমাসের আগে রত্নাবলী ও আটজন সহশিল্পী শহরের এক হোটেলে ক্রিসমাস-থিমে আল্পনা এঁকেছিলেন—ড্রাইভওয়ে, বারান্দা, লবি, এমনকি দুটি সিঁড়িও সেজে উঠেছিল তাঁর নকশায়।
“এখন অনেক আত্মবিশ্বাস পেয়েছি,”—হাসতে হাসতে বললেন তিনি। “কাঠের ফ্রেম আর মাটির পাত্রেও কাজ শুরু করেছি।”

রত্নাবলী ঘোষের তুলিতে যে শিল্প জন্ম নেয়, তা শুধু নকশা নয়—এ যেন এক বার্তা। শহরের দেয়াল, পথ, বাড়ি আর মানুষের মনে তিনি জাগিয়ে তুলছেন সৌন্দর্যের বোধ, ঐতিহ্যের টান, আর নিঃস্বার্থ আনন্দের অনুভব।