রৌদ্রজ্জ্বল এক সকালে, যখন অনেক শিশু স্কুলের পথে রওনা দেয়, তখন বেদার্থ হয়তো বাড়িতেই বসে একটি রোবটের প্রোটোটাইপের খসড়া আঁকছে। কিছুক্ষণ পরে সে বাড়ির উঠোনে ছোট্ট একটি কাপকেকের স্টল সাজিয়ে বসতে পারে—ক্রেতাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বিক্রির হিসেব কষে নিচ্ছে। আবার কখনও একটি গাছের ছায়ায় রঙিন মলাটের বইয়ের স্তূপ নিয়ে বসে পড়ছে, সম্পূর্ণভাবে ডুবে যাচ্ছে ভাবনার এক অন্য জগতে।
বেদার্থের শেখার প্রক্রিয়া মূলত শ্রেণিকক্ষের বাইরে গড়ে ওঠে—দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত আগ্রহই তার শিক্ষার ভিত। এটাই গুজরাটের নয় বছর বয়সি বেদার্থের নিত্যদিনের বাস্তবতা। তার পরিবার বেছে নিয়েছে শিক্ষার এক বিকল্প পথ, যার নাম আনস্কুলিং।
কৌতূহলী মনের কাজকর্ম
পরিচয় করুন বেদার্থের সঙ্গে—একটি ছেলে, যার শিক্ষা ঘটে মূলত তার চারপাশে ঘটে চলা, নানা কাজকর্ম থেকেই। তার কাছে প্রতিটি মুহূর্তই নতুন কিছু আবিষ্কার, সৃষ্টি ও বেড়ে ওঠার সুযোগ। নিজের পছন্দের বই পড়া, রোবোটিক্স ও লেগো কর্মশালায় অংশ নেওয়া, আর হাতে-কলমে নানা প্রকল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সে সময় কাটায়।
রোবট নিয়ে খুঁটিনাটি কাজের পাশাপাশি সে বাড়ির কাজেও সাহায্য করে। নতুন শখ যেমন সহজে রপ্ত করে, তেমনই স্বাভাবিকভাবে আয়ত্ত করে নেয় জীবনদক্ষতাও। স্কুলের পরের সময়ে অনেক সময় বেদার্থ ছোট কাপকেক বা চকলেটের স্টল বসায়—এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সে পরিশ্রম, বিনিময় ও অর্থের প্রাথমিক ধারণাগুলো বুঝে নিতে শেখে।
এতেই থেমে থাকে না বেদার্থের শেখা। তার মায়ের নির্দেশনায় তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে সঞ্চয় ও তার দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার সঙ্গে—এসআইপি (Systematic Investment Plan) বা নিয়মিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার মাধ্যমে। ধীরে ধীরে সে অল্প কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছে, যা তাকে ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং মৌলিক আর্থিক ধারণা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করেছে।
জানতে চান, এই যাত্রার নেপথ্যে কে?
এই যাত্রার পেছনে রয়েছেন তার মা বৃশুতি। পেশায় তিনি একজন স্থপতি। একসময় নিজের স্কুলজীবন নিয়ে ভাবতে গিয়ে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন—ছেলের জীবনের শুরুর দিকের শেখার অভিজ্ঞতা তিনি কেমন হতে দেখতে চান?
কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় ভরা একটি শৈশব, সন্তানকে উপহার দিতে তিনি বেছে নেন আনস্কুলিং নামের এই বিকল্প পথ—যেখানে শেখা চলে আগ্রহের টানে, সিলেবাসের চাপে নয়।
প্রতিদিন সকালে তিনি ও বেদার্থ মিলে একটি সরল দিনের পরিকল্পনা করতেন। আর রাতে একসঙ্গে বসে নিজেদের জিজ্ঞেস করতেন—
“আজ তুমি কী শিখলে?”
“কোনটা কাজ করেনি, আর কেন?”
নয় বছর ধরে এই আত্মসমীক্ষার চক্রই গড়ে তুলেছে বেদার্থের শেখার পথ—প্রতিদিন, প্রতিটি প্রশ্নে, প্রতিটি নতুন আবিষ্কারে।
শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবতা কতদূর?
আনস্কুলিং পদ্ধতি নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। বহু শিক্ষাবিদ শিশুর বিকাশে সামাজিক মেলামেশা, কাঠামো ও সমবয়সিদের মতামতের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। যারা বিকল্প শিক্ষাপথ বেছে নেন, তারা সাধারণত খেলাধুলো, কর্মশালা ও দলগত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাগুলো তৈরি করার চেষ্টা করেন, শ্রেণিকক্ষের বাইরে।
বেদার্থ নিয়মিত টেনিস খেলে এবং লেখালেখি করতে ভালোবাসে—এই অভিজ্ঞতাগুলিও তার সামগ্রিক শিক্ষা-যাত্রার অংশ। আজ বেদার্থ ও তার মা আনস্কুলিং বিষয়ক কর্মশালার মাধ্যমে অন্য উৎসাহী পরিবারগুলিকেও সহায়তা করেন, নিজেদের শেখা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। বেদার্থের এই যাত্রা সব শিশুর জন্য কোনও সর্বগ্রাহ্য নির্দিষ্ট নকশা বা মডেল নয়। তবে এটি বড় এক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে—যেখানে কৌতূহল ও সহায়তার হাত ধরে, শিক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে নানা রূপ নিতে পারে। তবে প্রশ্ন একটাই, পড়াশোনা করে চাকরি করতে হলে আদৌ কি এই পন্থা নেওয়া সম্ভব?


